ইসলামি শরিয়তে কোরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন— “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব, আপনি আপনার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়ুন ও কোরবানি করুন” (সূরা আল কাওসার: ১-২)। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কোরবানি করে না, তাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন, তারা যেন ঈদগাহের ধারে-কাছেও না আসে (ইবনে মাজাহ)।
কোরবানির অর্থ ও তাৎপর্য
কোরবানি শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সান্নিধ্য লাভ বা নিকটবর্তী হওয়া। পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় একে ‘কুরবান’ বা ‘নাহার’ বলা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো নিজের পশুপ্রবৃত্তি ও জাগতিক মোহ বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
কোরবানির ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। পৃথিবীতে মানুষের পদচারণার শুরু থেকেই এই ইবাদতের প্রচলন ছিল।
১. হাবিল ও কাবিলের কোরবানি: পৃথিবীর প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমেই কোরবানির সূচনা হয়। হাবিল ছিল আল্লাহভীরু এবং কাবিল ছিল অবাধ্য। যখন তাদের দুজনকে কোরবানি দিতে বলা হলো, আল্লাহ হাবিলের কোরবানি কবুল করলেন কিন্তু কাবিলেরটি প্রত্যাখ্যান করলেন। এই ঘটনার রেশ ধরেই পৃথিবীতে প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল মায়েদায় এই ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
২. হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগ: বর্তমানে আমরা যে কোরবানি পালন করি, তা মূলত জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নাত। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু (খলিলুল্লাহ) ইব্রাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে তাঁর কলিজার টুকরা সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। ইব্রাহিম (আ.) এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে যখন তাঁর পুত্রকে জবেহ করতে উদ্যত হলেন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দুম্বা প্রেরিত হয় এবং সেটি জবেহ হয়। এই মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে।
কোরবানির শিক্ষা ও গুরুত্ব
কোরবানি কেবল পশু জবাই করার নাম নয়, এটি ঈমান ও তাকওয়ার পরীক্ষা। মানুষের হৃদয়ে অর্থ-সম্পদ ও সন্তানের যে প্রবল মোহ থাকে, তা আল্লাহর নির্দেশের সামনে তুচ্ছ করার নামই হলো কোরবানি। এটি আমাদের পরকালের প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি করে।
কোরবানির বিধান ও সামাজিক শিক্ষা
কোরবানি সচ্ছল প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। এই ইবাদতের সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম:
বণ্টন পদ্ধতি: কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা সুন্নত।
সামাজিক সম্প্রীতি: কোরবানির মাধ্যমে সমাজের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর হয় এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায়।
হক আদায়: কোরবানির পশুর চামড়ার টাকা কেবল জাকাতের হকদাররাই পাওয়ার যোগ্য, এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
উপসংহার: কোরবানি আমাদের ত্যাগ, ধৈর্য ও বিনয় শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে সহিহ নিয়তে কোরবানি করার এবং এর প্রকৃত শিক্ষা আমাদের জীবনে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট ও হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ছাহেব।
মন্তব্য করুন