
কবি রজনীকান্ত সেন তাঁর কালজয়ী কবিতায় লিখেছিলেন, “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।” গ্রামবাংলার নিখুঁত কারিগর হিসেবে পরিচিত বাবুই পাখি একসময় ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নড়াইলে এখন সেই বাবুই পাখিই টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
মাত্র এক দশক আগেও নড়াইলের গ্রামাঞ্চলে তাল ও খেজুর গাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাবুই পাখির নান্দনিক বাসা ছিল পরিচিত দৃশ্য। মেঠোপথ কিংবা বাড়ির আঙিনায় চোখে পড়ত তাদের শৈল্পিক নিদর্শন। কিন্তু বর্তমানে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরেও সেই চিরচেনা দৃশ্য আর দেখা যায় না। তাল গাছের ক্রমহ্রাস, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে বাবুই পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, নির্বিচারে তালগাছ নিধন বাবুই পাখির আবাসস্থল ধ্বংসের প্রধান কারণ। পাশাপাশি ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। একসময় জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে বাবুই পাখির বাসা দেখা গেলেও এখন তা বিলুপ্তপ্রায়।
বাবুই পাখি তাদের বাসা তৈরির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। পুরুষ বাবুই প্রথমে অর্ধেক বাসা তৈরি করে স্ত্রী পাখির সম্মতির অপেক্ষা করে। স্ত্রী পাখি বাসা পছন্দ করলে ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে বাসা সম্পূর্ণ করা হয়। বাসার নিচের দিকে দুটি ছিদ্র রাখা হয়—একটি প্রবেশপথ এবং অন্যটি পরবর্তীতে ডিম রাখার জন্য নিরাপদ স্থানে রূপান্তরিত হয়। একটি পুরুষ বাবুই মৌসুমে সর্বোচ্চ ছয়টি বাসা তৈরি করতে সক্ষম। তারা খড়, তালপাতা, কাশ ও লতাপাতা দিয়ে নিপুণভাবে বাসা বোনে।
বিশ্বে প্রায় ১১৭ প্রজাতির বাবুই পাখি থাকলেও বাংলাদেশে দেশি, দাগি ও বাংলা—এই তিন প্রজাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে দাগি ও বাংলা প্রজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশি বাবুই সীমিত আকারে কিছু এলাকায় টিকে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, বাবুই পাখি শুধু একটি পাখি নয়; এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। তাই এর সংরক্ষণে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। নড়াইলের বিএনপি নেতা টিপু মোল্লা বলেন, সচেতনতা ছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তিনি পাখি শিকার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
প্রকৃতির এই নিপুণ কারিগরকে রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বাবুই পাখিকে কেবল বইয়ের পাতাতেই চিনবে।
মন্তব্য করুন