
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস—এই তিনকে সঙ্গী করে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় গড়ে উঠেছে ‘হাসিনা এগ্রো ফার্ম ও নার্সারি’। আর এর পেছনের সাহসী নারী উদ্যোক্তা হলেন হাসিনা ইয়াসমিন, যিনি জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজশাহী শহরের কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ের একটু সামনে অবস্থিত তার এই প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খুব অল্প বয়সে বিবাহ হয় হাসিনা ইয়াসমিনের। স্বামী ছিলেন বেকার; কোনো রকমে চলছিল সংসার। এরই মধ্যে জন্ম নেয় একটি কন্যা সন্তান। কিন্তু হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে জীবন যেন অন্ধকারে ঢেকে যায়। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।
প্রথমে হাতের কাজ করে সংসার চালান তিনি। পরে সাহস করে একটি তৈরি পোশাকের শোরুম চালু করেন। ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করে। মেয়েও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। পাশাপাশি একটি স্কুলে চাকরিও পান তিনি। নিজের উন্নয়নের জন্য বগুড়া থেকে জৈব সার তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলেন একটি নার্সারি।
তবে জীবনের পথে বাধা থেমে থাকেনি। কিছু অসাধু চক্রের কারণে স্কুলের চাকরি হারাতে হয় তাকে। কিন্তু তাতেও ভেঙে পড়েননি। বরং নতুন উদ্যমে এগিয়ে যান। মেয়ের বিয়ের পর জামাতাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন জৈব সার উৎপাদনের কারখানা। ‘ড্রাইকো ভার্মা’ সমৃদ্ধ জৈব সার দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় কৃষকদের মধ্যে।
একই সঙ্গে নার্সারির কার্যক্রমও বিস্তৃত হতে থাকে। বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থানে পৌঁছে যায়। বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকে কৃষকরা তার জৈব সার সংগ্রহ করতে আসেন।
শুধু নিজের উন্নয়নেই থেমে থাকেননি হাসিনা ইয়াসমিন। তার প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় অসহায় নারী-পুরুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এখানে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কৃতও হয়েছেন। এমনকি বিদেশি প্রতিনিধিরাও তার জৈব সার প্রকল্প পরিদর্শনে এসেছেন।
সাফল্যের এই পর্যায়েও থেমে নেই তার পথচলা। সম্প্রতি তিনি মুরগির খামার স্থাপন করেছেন। মুরগি ও হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেছেন। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়ে তিনি এখন একজন অনুকরণীয় নারী উদ্যোক্তা।
সংগ্রাম, সাহস আর অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হাসিনা ইয়াসমিন—যিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, দৃঢ় মনোবল থাকলে সাফল্য ধরা দেয় হাতের মুঠোয়।
মন্তব্য করুন