
খুলনায় গত আট দিনের ব্যবধানে পাঁচটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মহানগরীতে তিনটি এবং জেলায় দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরপর এসব হত্যার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও চরমপন্থি সংযোগকে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত দেড় বছরে খুলনায় ৬০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নদ-নদী থেকে শতাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়ে গেছে। সন্ধ্যা নামলেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আফিল গেট এলাকার একটি মোটর গ্যারেজে মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য অবস্থান করছিলেন ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। দুপুর ৩টার দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই যুবকের একজন তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। মাথায় গুলি লাগলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত হত্যার কোনো ক্লু উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
এর একদিন পর দিঘলিয়া উপজেলায় পূর্ব শত্রুতার জেরে খুন হন সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদল নেতা মুরাদ খান। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মেয়ের জুতা কিনতে স্থানীয় একটি দোকানে গেলে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা কয়েকজন হামলাকারী তাকে রগ কেটে হত্যা করে। এ ঘটনায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং মূল আসামি সাজ্জাদকে ঢাকার তেজগাঁও এলাকা থেকে আটক করা হয়।
এদিকে গত ২ মার্চ রাতে নগরীর নিরালা মোড় সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোড এলাকায় পূর্ব বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ নামে এক যুবক খুন হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। একইভাবে গত বুধবার সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ। এ ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি তেরখাদা উপজেলায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হন মামুন মোল্লা নামে এক যুবক। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ মার্চ তার মৃত্যু হয়।
শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, প্রায় প্রতিরাতেই খুলনার বিভিন্ন এলাকায় হামলা, গুলি ও ছুরিকাঘাতের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি নগরীর টুটপাড়া এলাকায় ছুরিকাঘাতে ছাত্রদল নেতা সাব্বির গুরুতর আহত হন। এছাড়া লবণচরা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে হাবিবুর রহমান নামে এক রিকশাচালক আহত হয়েছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত. ম. রোকনুজ্জামান বলেন, নগরীর বস্তি এলাকাগুলোতে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি রয়েছে, যারা বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনার নাগরিক সমাজের নেতারা। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, পরপর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে খুলনা সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়বে। তাই সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মন্তব্য করুন