
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সুন্দরবনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে হরিণশিকারি চক্র—এমন আশঙ্কায় পুরো বনাঞ্চলে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে বন বিভাগ। সম্ভাব্য চোরা শিকার প্রতিরোধে ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি, এমনকি ঈদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে টহল ও নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদের সময় হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এই সুযোগে শিকারি চক্রগুলো সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ফাঁদ পেতে চিত্রল হরিণ শিকার করে। পরে নদীপথ ও স্থলপথে সেই মাংস পাচার হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরে পৌঁছে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। এ সময় হরিণের মাংসের চাহিদা ও দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে শিকারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। বনসংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিকারিরা রাতের আঁধারে ছোট ছোট খালপথে নৌকা নিয়ে অথবা পায়ে হেঁটে বনের ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, শিকারিদের প্রধান টার্গেট চিত্রল হরিণ হলেও তাদের পাতা বিভিন্ন ফাঁদে অন্য বন্য প্রাণীও আটকা পড়ে। ছিটকা ফাঁদ, মালা ফাঁদ ও হাঁটা ফাঁদের কারণে বাঘ, বন্য শূকর, বানরসহ নানা প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে পড়া একটি জীবিত বাঘ উদ্ধার করা হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ বরগুনার পাথরঘাটা এলাকা থেকে দুই মণ ওজনের দুটি জবাই করা হরিণ, একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ২৭৫ ফুট ফাঁদসহ এক শিকারিকে আটক করা হয়। গত ১০ মাসে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৭৫ হাজার ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ, ২৪২ কেজি হরিণের মাংস, ৩৫২টি ট্রলার ও নৌকা, ৮১৬ কেজি কাঁকড়া, পাঁচ হাজার কাঁকড়া ধরার চারু, ২৩১টি মাছ ধরার জাল, ২২ বস্তা শুঁটকি মাছসহ বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ৩১৩ জনকে আটক করে বন আইনে মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী, ডিমেরচর, কোকিলমনি, সুপতি, ছাপড়াখালী, আলোরকোল, দুবলা, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, মরাপশুর, চাঁন্দেশ্বর, মরা ভোলা ও ধানসাগরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে হরিণ শিকারসহ বিভিন্ন বন অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে।
এ ছাড়া বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল; পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া; বরগুনার পাথরঘাটা ও চরদোয়ানী; খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় বন্য প্রাণী শিকার ও পাচারকারী একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি বনদস্যুদের সম্পৃক্ততার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী একটি মহল এসব চক্রকে আড়ালে থেকে অর্থ ও প্রভাব দিয়ে সহায়তা করে। ফলে অনেক সময় শিকারিরা ধরা পড়লেও দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বন বিভাগের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিকারে জড়িত সন্দেহভাজন প্রায় ১৫০ জনের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের আওতায় তাদের গোপনে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে যাতে কোনো শিকারি চক্র সুন্দরবনে প্রবেশ করে বন্য প্রাণী শিকার করতে না পারে, সে জন্য পুরো বনাঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনের হরিণশিকারি, বনদস্যু ও বিষদস্যুদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান জোরদার করা হবে। সুন্দরবন রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।”
মন্তব্য করুন