
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে চলতি মৌসুমে গোলপাতা আহরণের অনুমতি না মেলায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো বাওয়ালী পরিবার। ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, জীবিকা নির্বাহ নিয়েই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। বন বিভাগের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণের অনুমতি দিয়ে থাকে বন বিভাগ। এ সময় বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল, মংলা ও পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার বনসংলগ্ন এলাকার হাজার হাজার বাওয়ালী বংশপরম্পরায় গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। মৌসুমে অন্তত দুই চালান গোলপাতা বিক্রি করে সারা বছরের খরচের বড় একটি অংশ জোগাড় করেন তারা।
চলতি মৌসুমের শুরুতে বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বাওয়ালী ও সংশ্লিষ্ট মহাজনরা নৌকার বোর্ড লাইসেন্স (বিএলসি) সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি বন বিভাগের আশ্বাসে অনেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে নৌকা মেরামত ও প্রস্তুত করেন। তবে মৌসুমের প্রায় তিন মাস পার হলেও এখনো গোলপাতা আহরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি, যা এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সোনাতলা গ্রামের বাওয়ালী মোফাজ্জল হোসেন ও দক্ষিণ রাজাপুরের আফজাল চাপরাশী জানান, তারা মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সুন্দরবনে যেতে পারেননি। ফলে তারা যেমন আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন, তেমনি এখন ঋণের বোঝাও মাথায় চাপছে। এতে করে ঈদের আনন্দ তাদের জীবনে এখন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
মালিয়া গ্রামের বাওয়ালী দেলোয়ার হাওলাদার বলেন, “বন বিভাগ অনুমতি না দেওয়ায় শতশত বাওয়ালী দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার এখন ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। ঈদ উদযাপনের মতো পরিস্থিতি তাদের নেই।”
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের গোলপাতা ব্যবসায়ী সেলিম ব্যাপারী অভিযোগ করে বলেন, বন বিভাগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা নৌকার লাইসেন্স সংগ্রহ ও মেরামতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু পরে অনুমতির জন্য দপ্তরে গেলে নানা জটিলতা তৈরি করা হয়। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। একই অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী জাকির হোসেন ও সাইফুল ইসলাম খোকন। তারা জানান, আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ অনুমতি বন্ধ করে দেওয়ায় এ খাতের সঙ্গে জড়িত সবাই কার্যত বেকার হয়ে পড়েছেন।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, দ্রুত গোলপাতা আহরণের অনুমতি প্রদান অথবা বিকল্প সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ অঞ্চলের হাজারো পরিবার মানবিক সংকটে পড়বে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নৌকার বোর্ড লাইসেন্সের সঙ্গে বাস্তব নৌকার আকারের ব্যাপক অমিল থাকায় এ বছর অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, নৌকার অস্বাভাবিক আকার ও অনিয়মের কারণে কোনো বিএলসি নবায়ন করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, গোলপাতা আহরণের অনুমতি বন্ধ থাকায় উপকূলীয় বাওয়ালী পরিবারগুলো এক কঠিন সময় পার করছে। সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে তাদের জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন