
বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে এক উজ্জ্বল নাম কুসুম্বা মসজিদ। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবেই নয়, বরং দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, অনেকের ধারণার বিপরীতে এই মসজিদটি মুঘল আমলের নয়; বরং এটি সুলতানি আমলের স্থাপত্য। ১৫৫৮ থেকে ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুলায়মান নামের এক অভিজাত ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের গায়ে খোদাই করা শিলালিপিতে নির্মাণকালসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা এর ঐতিহাসিক সত্যতাকে প্রমাণ করে।
কুসুম্বা মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর নির্মাণশৈলী। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রাচীন মসজিদ যেখানে ইট দিয়ে নির্মিত, সেখানে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে পাথর দিয়ে। ফলে এটি স্থাপত্যগত দিক থেকে আলাদা মর্যাদা লাভ করেছে। মসজিদের দেয়ালে সূক্ষ্ম কারুকাজ, নান্দনিক নকশা এবং শক্তপোক্ত গঠন দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। এর শৈল্পিক সৌন্দর্য এতটাই আকর্ষণীয় যে, একসময় লোকমুখে প্রচলিত ছিল—এটি নাকি জিনদের দ্বারা নির্মিত। যদিও এটি নিছক একটি লোককাহিনি, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি বড় দিঘী, যা একসময় স্থানীয় মানুষের পানির প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে সেখানে মাছ চাষ করা হয়। যদিও আগের মতো পানির ব্যবহার কমে গেছে, তবুও দিঘীটি মসজিদের চারপাশে এক মনোরম ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করে, যা দর্শনার্থীদের জন্য অতিরিক্ত আকর্ষণ যোগ করে।
বর্তমানে কুসুম্বা মসজিদ একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখতে ভিড় জমান। বিদেশি পর্যটকদের জন্য এখানে গেস্ট রুম নির্মাণ করা হয়েছে, যা তাদের রাত্রিযাপনের সুবিধা নিশ্চিত করছে।
জাতীয় পর্যায়েও এই মসজিদের গুরুত্ব স্বীকৃত। বাংলাদেশের ৫ টাকার নোটে কুসুম্বা মসজিদের ছবি স্থান পেয়েছে, যা এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, কুসুম্বা মসজিদ আমাদের গৌরবময় অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী। এর স্থাপত্যশৈলী, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি নতুন করে গর্ববোধ জাগায়। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ এবং এর সঠিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন