
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী, প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের জন্মবার্ষিকী। জগন্নাথপুরের কৃতি সন্তান আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক, যিনি আজীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
আব্দুস সামাদ আজাদ ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন সিলেট জেলার জগন্নাথপুর থানার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের ভূরাখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শরীয়ত উল্লাহ এবং তিনি ছিলেন পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বগুণ ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়।
শিক্ষাজীবনে তিনি প্রথমে গ্রামের স্কুলে এবং পরে দিরাই উপজেলার জগদল ভাটিরগাঁও স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৮ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও ইতিহাস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তৎকালীন সরকার তাঁর এমএ ডিগ্রি বাতিল করে দেয়—যা তাঁর সংগ্রামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয় ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৪০ সালে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে অবিভক্ত আসাম প্রদেশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯-৫০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন জানানোয় তাঁকে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
১৯৫১ সালে আব্দুস সামাদ আজাদ পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ১৯৫২ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। রাজনৈতিক দক্ষতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার কারণে ১৯৫৩ সালে তিনি যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে সুনামগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং আদর্শগত কারণে ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যুক্ত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ চার বছর কারাবন্দি থাকতে হয়। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন এবং সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে তিনি মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যান। ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জগন্নাথপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শ্রদ্ধা ও স্মরণে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ত্যাগ ও অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন