
বিশ্বের ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনজুড়ে শুরু হয়েছে মধু আহরণের ব্যস্ত মৌসুম। বন বিভাগের র্ধারিত সময় অনুযায়ী সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকা থেকে মৌয়ালরা দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করছেন, মধুর সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছেন বন থেকে বনের গভীরে। জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই তারা এই মৌসুমে নিজেদের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস সংগ্রহে নেমেছেন।
প্রতিটি মৌয়াল দলের নেতৃত্বে থাকেন একজন অভিজ্ঞ “সর্দার”, যিনি বনাঞ্চলের পথঘাট, মৌমাছির আচরণ এবং মৌচাকের অবস্থান সম্পর্কে সুপরিচিত। গাছের ডালপালা, ফুলের সুবাস এবং মৌমাছির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তারা নির্ধারণ করেন কোথায় রয়েছে মধুভর্তি চাক। চাক শনাক্ত হওয়ার পর ধোঁয়ার সাহায্যে মৌমাছি তাড়িয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মধু সংগ্রহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি যেমন দক্ষতার দাবি রাখে, তেমনি এতে রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি।
মৌয়ালদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণ। প্রায়ই বাঘের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। এছাড়া বনের ভেতরে বিষধর সাপ, কুমির এবং দুর্গম খাল-বিল তাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে করে তোলে বিপজ্জনক। তবুও জীবিকার তাগিদে এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেই তারা প্রতিদিন বনে প্রবেশ করছেন।
স্থানীয় মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের এই সময়টিতে সংগৃহীত মধুই তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। অনেক মৌয়াল ঋণ নিয়ে বনে প্রবেশ করেন, আশায় থাকেন পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করবেন। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডাকাতের আশঙ্কা কিংবা বন্যপ্রাণীর আক্রমণে অনেক সময় তাদের সেই আশা ভঙ্গ হয়।
বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে বনে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং নির্ধারিত সময় ও এলাকা মেনে মধু আহরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যাতে বনজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত থাকে।
তিনি আরও জানান, পহেলা এপ্রিল থেকে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে ২৪টি নৌকায় ১৬৭ জন মৌয়াল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে মোট ৪৬টি পাসের বিপরীতে ৩১২ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন মধু আহরণের উদ্দেশ্যে।
এদিকে, স্থানীয় বাজারগুলোতে সুন্দরবনের খাঁটি মধুর চাহিদা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মৌসুম ভালো হলে বাজারে মধুর সরবরাহ বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
সব মিলিয়ে, সুন্দরবনের গভীরে মৌয়ালদের এই নিরলস পরিশ্রম কেবল তাদের জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলা এই মানুষগুলোই তুলে আনছেন প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ—খাঁটি মধু।
মন্তব্য করুন