
সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত কটকা—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এক পর্যটন এলাকা। নদী, খাল আর ঘন অরণ্য পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এই স্থানে। একদিকে বিস্তৃত বনভূমি, অন্যদিকে খোলা সমুদ্র—প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য কটকাকে করেছে অনন্য। তবে এই মনোমুগ্ধকর স্থানটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর স্মৃতির নাম হয়ে আছে।
২০০৪ সালের ১২ মার্চ একাডেমিক সফরের অংশ হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৭৮ জন শিক্ষার্থী ও ২০ জন অতিথি খুলনা থেকে কটকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সফরের উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করা।
পরদিন ১৩ মার্চ সকাল ১১টার দিকে তারা কটকার নিকটবর্তী বাদামতলী এলাকায় পৌঁছান। গভীর অরণ্য পেরিয়ে দুপুরের দিকে দলটি কটকা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছালে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ভুলে অনেকে সমুদ্রে নামেন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন সবাই।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। হঠাৎ সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসে সাহায্যের আর্তনাদ। সাগরের ঢেউয়ের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তলিয়ে যেতে দেখা যায়। তাদের উদ্ধারে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেও প্রবল স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে সবাইকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৯ জন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ২ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। কটকার উত্তাল স্রোত কেড়ে নেয় ১১টি সম্ভাবনাময় প্রাণ।
এই মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্মাণ করা হয়েছে ‘কটকা ট্র্যাজেডি স্তম্ভ’। সেই থেকে প্রতি বছর ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’ পালন করা হয়। এদিন শোকর্যালি, কালো ব্যাজ ধারণ এবং স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হয়।
কটকার সেই ট্র্যাজেডি শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর প্রাণই কেড়ে নেয়নি; নিভিয়ে দিয়েছে বহু স্বপ্ন, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার আলো।
মন্তব্য করুন