
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবন—বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখা এক প্রাকৃতিক দুর্গ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘনঘন আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ভূমিক্ষয়ের মতো দুর্যোগে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে এই বিশ্বঐতিহ্য। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, সুন্দরবন দিবস। ভালোবাসা দিবসে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদকে ভালোবাসা ও সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হচ্ছে দেশজুড়ে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিস্তীর্ণ বনভূমি কেবল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারই নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এখানে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। প্রাণিকুলের মধ্যে রয়েছে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির উভচর এবং ৩৫৫ প্রজাতির পাখি।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯২ সালে এটিকে Ramsar Convention অনুযায়ী রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর UNESCO সুন্দরবনকে বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এসব স্বীকৃতি সুন্দরবনের বৈশ্বিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।
২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশসহ দেশের প্রায় ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলন থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ধারাবাহিকভাবে এ বছর পালিত হচ্ছে ১৮তম সুন্দরবন দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে বরাবরের মতো এবছরও খুলনায় মূল কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনার, র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুন্দরবন রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ বন উজাড়, নদীভাঙন ও দূষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন কেবল একটি বনভূমি নয়—এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন, প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের মূলভিত্তি। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নীতি অনুসরণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
সুন্দরবন দিবসে সবার প্রত্যাশা—ভালোবাসা হোক দায়িত্ববোধে পরিণত, আর সচেতনতার মাধ্যমে রক্ষা পাক বিশ্বের এই অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
মন্তব্য করুন