অনলাইন ডেস্ক
৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:১১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো?

ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো?
ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো?

ডিজিটাল মানব হওয়ার দৌড়ে আমরা এখন আর শুধু মানুষ নই—আমরা কনটেন্ট। আর সেই কনটেন্টের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনীমঞ্চ আমাদের প্রিয় সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক। একসময় যাকে বলা হতো ‘ভার্চুয়াল স্পেস’, আজ তা এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে যে, পাবলিক ও প্রাইভেটের মধ্যকার সীমারেখা প্রায় বিলীন। প্রশ্ন জাগে—আমরা কি ফেসবুক ব্যবহার করছি, নাকি ফেসবুকই আমাদের ব্যবহার করছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একই সঙ্গে কৌতুককর ও উদ্বেগজনক। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আয়নায় মুখ দেখার আগেই চোখ পড়ে ফেসবুকের নিউজফিডে। কে কী খেল, কে কোথায় গেল, কার সংসারে ঝামেলা, কার বাচ্চা আজ কী খেল—সবকিছুই এখন ‘পাবলিক নলেজ’। ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো আর ব্যক্তিগত নেই; লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের সংখ্যাই যেন তার সামাজিক বৈধতা নির্ধারণ করে।

একসময় ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল ঘরের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ। এখন দুঃখও স্ট্যাটাস হয়—“মনটা আজ খুব খারাপ”—এরপর অপেক্ষা, কে কতটা সমবেদনা জানাল। কেউ কমেন্ট না করলে দুঃখটাও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সুখের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। বিয়ে, জন্মদিন, সন্তান জন্ম কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর—সবই এখন লাইভ আপডেট। মনে হয়, ফেসবুকে না এলে ঘটনাগুলোর অস্তিত্বই যেন প্রশ্নবিদ্ধ।

এ দেশের বাস্তবতায় ফেসবুক এখন আর নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদালত। একটি স্ট্যাটাস, একটি পুরোনো ছবি কিংবা পাঁচ বছর আগের কোনো মন্তব্য—এই সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য যথেষ্ট উপকরণ তৈরি হয়ে যায়। কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী; কে প্রগতিশীল, কে প্রতিক্রিয়াশীল—এই রায় অনেক সময় দেওয়া হয় একটি স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে। প্রমাণের প্রয়োজন নেই, প্রসঙ্গ বোঝার দায় নেই; দরকার শুধু ভাইরাল হওয়ার মতো একটি বাক্য।

আরো পড়ুন...  কালিয়ায় অবৈধ ইটভাটা সিলগালা, ২ লাখ টাকা জরিমানা

ব্যঙ্গের বিষয় হলো, এই বিচারব্যবস্থার স্বেচ্ছাসেবী বিচারক আমরা নিজেরাই। সকালে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা কারও চরিত্র বিশ্লেষণ করে ফেলি—“এই লোক তো ফেসবুকে এটা লিখেছে, নিশ্চয়ই ওর মানসিকতা এমনই।” বাস্তব জীবনে তার কাজ, অবদান বা আচরণ তখন গৌণ। একটি স্ট্যাটাসই হয়ে ওঠে মানুষের পূর্ণাঙ্গ সিভি। এর ফল হিসেবে সমাজে জন্ম নেয় এক ধরনের ডিজিটাল লেবেলিং সংস্কৃতি, যেখানে মানুষকে বোঝার চেয়ে তাকে ট্যাগ লাগানোই সহজ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বিপজ্জনক। একটি রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ মানেই এখন ঝুঁকি নেওয়া। শব্দচয়ন সামান্য এদিক-ওদিক হলেই আপনি রাতারাতি ‘বিপজ্জনক’, ‘বিকৃত’ কিংবা ‘এজেন্ডাবাজ’ তকমা পেতে পারেন। যুক্তির বদলে চলে ব্যক্তিগত আক্রমণ। মতের সঙ্গে দ্বিমত করার সংস্কৃতি নয়, মানুষকে হেয় করাই যেন প্রধান হাতিয়ার। অথচ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলো সহনশীলতা—যা এই ডিজিটাল কোলাহলে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, উন্নত দেশগুলো কি সত্যিই ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করে? উত্তর খুব সোজা—না। সেখানে সামাজিক মাধ্যম আছে, বিতর্ক আছে, তীব্র মতবিরোধও আছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক মূল্যায়ন কিংবা নীতিনির্ধারণের ভিত্তি কখনোই ফেসবুক পোস্ট নয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় গবেষণা, তথ্য, পরিসংখ্যান ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যম সেখানে মতপ্রকাশের একটি মাধ্যম—বিকল্প নয়।

পার্থক্যটা এখানেই। উন্নত সমাজে নাগরিকের প্রাইভেট স্পেসকে আইন ও সামাজিক রীতিনীতি—দুইভাবেই সম্মান করা হয়। একজন মানুষ কী ভাবছে, তা জানার অধিকার সবার থাকতে পারে; কিন্তু সেই ভাবনাকে টেনে এনে জনসমক্ষে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানানো হয় না—যতক্ষণ না তা আইন ভাঙছে। আমাদের সমাজে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বারবার উপেক্ষিত হয়। ফলে ফেসবুক হয়ে ওঠে সামাজিক উত্তেজনা তৈরির এক বিশাল কারখানা।

আরো পড়ুন...  টাঙ্গাইলে ঐতিহ্যবাহী গ্রামবাংলার লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু ব্যবহারকারীর নয়; নীতিনির্ধারকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত, ডিজিটাল লিটারেসিকে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সঙ্গে নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়েই শেখাতে হবে—কী শেয়ার করা উচিত, কী ব্যক্তিগত রাখা জরুরি এবং অনলাইনে ভিন্নমতকে কীভাবে সম্মান করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল অধিকার ও প্রাইভেসি নিয়ে স্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও অপব্যবহার-নিরোধক নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি—যে আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করবে না।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফেসবুকের বাইরে শক্তিশালী যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত যদি ফেসবুক স্ট্যাটাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই এই প্ল্যাটফর্মকে অযাচিত ক্ষমতা দিয়ে দেয়।

সবশেষে আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার—আমরা কি সত্যিই ডিজিটাল মানব হতে চেয়েছিলাম, নাকি শুধু অনিরাপদ এক দর্শক হয়ে উঠেছি, যে অন্যের জীবন স্ক্রল করতে করতে নিজের বিবেক হারিয়ে ফেলছে? ফেসবুক আমাদের হাতিয়ার হতে পারত; কিন্তু আমরা তাকে বিচারক বানিয়ে ফেলেছি। পাবলিক ও প্রাইভেট স্পেসের এই ঝাপসা সীমারেখা চলতে থাকলে একদিন হয়তো আবিষ্কার করব—আমাদের সমাজ খুবই কানেক্টেড, কিন্তু ভয়াবহভাবে বিভক্ত।

লেখক: অধ্যাপক,
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে গুঞ্জন, ‘কিছুই চূড়ান্ত হয়নি’

আত্মসাতের অভিযোগ ৬০ লাখ টাকা, ফেরত চাইতেই প্রাণনাশের হুমকি

মোরেলগঞ্জে জাল সনদে পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে ধরা, জরিমানা ৪ জন

মোংলায় জাতীয় গোয়েন্ধা সংস্থার সংবাদে অবৈধ তেলের গোডাউনে র‌্যাবের অভিযান

মাগুরায় চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ

জগন্নাথপুরে নববর্ষের শুভেচ্ছা লাকির

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান

শ্রীপুরে বিজ্ঞান মেলা শুরু

ঝালকাঠি চত্বর উদ্বোধন

পানছড়িতে বিজ্ঞান উৎসব শুরু

১০

চীন সফরে যাচ্ছেন এমপি মনোয়ার হোসেন

১১

১৯ ক্লাবের অংশগ্রহণে স্মার্ট কিশোরী প্রতিযোগিতা

১২

৭ মাস পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন

১৩

নাতিকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে ট্রেনে কাটা পড়ে বৃদ্ধ নিহত

১৪

ঝড়ে নোয়াখালী রেলপথে অচলাবস্থা

১৫

ফুলবাড়ীতে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৬

৬নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হতে প্রস্তুত ফকরুল বিশ্বাস

১৭

তেল বিক্রিকে কেন্দ্র করে পানছড়িতে সংঘর্ষ, আহত ৩

১৮

মোরেলগঞ্জে ছাত্রদল নেতা আলি আজিমকে জড়িয়ে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ, প্রতিবাদে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

১৯

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিবি পুলিশের হেরোইন উদ্ধার, নারী গ্রেপ্তার

২০