
দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অকটেন ও পেট্রোল সংকটের অভিযোগে সাধারণ মানুষ যখন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন, তখন বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গোপনে মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, দেশে তেলের চেয়ে বড় সংকট এখন সততা ও নৈতিকতার।
ভোক্তাদের অভিযোগ, একের পর এক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে “অকটেন নেই” কিংবা “তেল শেষ” এমন কথা শুনে ফিরে যেতে হচ্ছে। অথচ পরে দেখা যাচ্ছে, একই স্টেশনের ভেতরে বা গোপন সংরক্ষণাগারে হাজার হাজার লিটার তেল মজুত রাখা হয়েছে। এতে জনমনে ক্ষোভ ও সন্দেহ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এখন এক ধরনের পুরোনো কৌশল। চাহিদা বেশি দেখিয়ে সরবরাহ সীমিত রাখা হয়, যাতে বাড়তি দামে তেল বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
একজন ভোক্তা বলেন, “পাম্পে গিয়ে বলা হয় তেল নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখা যায়, অন্য গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে মনে হয় কোথাও না কোথাও গোপন মজুত রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। কারণ, যদি দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে, তাহলে বাজারে সংকটের আবহ তৈরি হওয়ার পেছনে অবশ্যই কোনো অসাধু চক্র কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে তেল গোপন করে রাখেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, পরিবহন খাতে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হয়।
ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে গোপনে মজুত রাখা তেল উদ্ধার করেছে। অভিযানে কয়েকজনকে জরিমানা ও কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীকে শাস্তি দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি তেলের নয়; বরং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতার। তাদের দাবি, বাজারে যদি কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল মনিটরিং এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এমন কৃত্রিম সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
ভোক্তা অধিকারকর্মী ও সচেতন মহলও বলছে, জ্বালানি খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে শুধু তেল নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, এখন সাধারণ মানুষের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ফিলিং স্টেশনগুলোতে গোপনে তেল মজুত রাখার সুযোগ কেন থাকে? তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আর এই কৃত্রিম সংকট তৈরির পেছনে কোনো বড় সিন্ডিকেট সক্রিয় কি না?
জ্বালানি তেলের এই গোপন মজুতের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, দেশে হয়তো তেলের সংকট নেই; কিন্তু নৈতিকতার সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। আর এই সংকট দূর করতে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা, কার্যকর নীতি এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
লেখক : প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের,
সাংবাদিক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, কবি ও উপন্যাসিক।
মন্তব্য করুন