
ইসলামি অর্থব্যবস্থায় জাকাত একটি মৌলিক ও অপরিহার্য বিধান। ঈমান ও নামাজের পর জাকাত আদায়কে একজন সামর্থ্যবান মুসলমানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাকাত কেবল দান নয়; এটি সম্পদের পবিত্রতা, সামাজিক ভারসাম্য ও দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হয়।
শরিয়ত অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলমান নারী-পুরুষের মালিকানাধীন সম্পদের ওপর কিছু শর্ত পূরণ হলে জাকাত ফরজ হয়। প্রথমত, সম্পদের ওপর পূর্ণ এক চান্দ্র বছর মালিকানা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্পদটি এমন হতে হবে যার ওপর জাকাত প্রযোজ্য। তৃতীয়ত, সম্পদের পরিমাণ নিসাব সমপরিমাণ বা তার বেশি হতে হবে। চতুর্থত, সম্পদটি মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। এখানে মালিকানা বলতে বোঝানো হয়—কোনো ব্যক্তি শরিয়তসম্মতভাবে সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ভোগদখলের অধিকার রাখবেন এবং অন্য কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
নগদ অর্থ, সোনা-রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য, পালিত পশু ও কৃষিজ পণ্যের ওপর জাকাত ধার্য হয়। তবে ওয়াকফ সম্পত্তি, সরকারি সম্পদ, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী, বসবাসের বাড়ি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য গাড়ির ওপর জাকাত প্রযোজ্য নয়। কৃষিজ ফসলের ক্ষেত্রে পূর্ণ এক বছর অতিক্রমের শর্ত নেই; ফসল আহরণের সঙ্গে সঙ্গেই উশর আদায় করতে হয়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত প্রদান করতে হয়।
ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যেমন -এ উল্লেখ আছে, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় না করা জমির ওপর জাকাত ওয়াজিব নয়। আবার -এর আলোকে মহিলাদের ব্যবহৃত স্বর্ণ-রূপার অলংকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অন্তর্ভুক্ত নয়; তাই তার ওপর জাকাত প্রযোজ্য। একইভাবে -এ বর্ণিত হয়েছে যে, নগদ টাকার জাকাত নির্ধারণে বাজারদরে রূপার মূল্য বিবেচ্য হবে।
যদি কারো কাছে পৃথকভাবে সোনা, রূপা বা নগদ অর্থ নিসাব পূরণ না করলেও সব মিলিয়ে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্য হয়ে যায়, তাহলে তার ওপরও জাকাত ফরজ হবে—এ কথা -এ উল্লেখ রয়েছে। বছরের মাঝে সম্পদ নিসাবের নিচে নেমে গেলেও বছরের শুরু ও শেষে নিসাব পূর্ণ থাকলে জাকাত ওয়াজিব হবে। আবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমি বা পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতি বছর বাজারমূল্য অনুযায়ী জাকাত আদায় করতে হবে, যা -এ বর্ণিত হয়েছে।
ঋণের বিষয়েও শরিয়তের নির্দেশনা রয়েছে। মোট সম্পদ থেকে পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত দিতে হবে। কারো কাছে ঋণ হিসেবে দেওয়া টাকা নিসাব পরিমাণ হলে ঋণদাতার ওপরই তার জাকাত প্রযোজ্য হবে। ব্যাংক বা সমিতিতে জমাকৃত অর্থ নিসাব পূর্ণ করলে বছরান্তে জাকাত আদায় করতে হবে; তবে সুদের অর্থ সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে, তার ওপর জাকাত নেই।
কারখানা বা ফ্যাক্টরির মেশিন ও স্থাপনার ওপর জাকাত নেই, কিন্তু কাঁচামাল ও বিক্রয়যোগ্য পণ্যের মূল্য নিসাব পূরণ করলে জাকাত ওয়াজিব হবে। ভাড়া দেওয়া বাড়ি বা মার্কেটের মূল্যের ওপর জাকাত না থাকলেও প্রাপ্ত ভাড়া নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত প্রযোজ্য হবে। একইভাবে ব্যবহৃত গাড়ির মূল্যের ওপর জাকাত নেই, তবে উপার্জিত আয় হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সর্বোপরি, জাকাত কেবল একটি আর্থিক বিধান নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর পদ্ধতি। সামর্থ্যবান মুসলমানদের উচিত শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সঠিক হিসাব করে জাকাত আদায় করা। আল্লাহ তাআলা যেন প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে যথাযথভাবে জাকাত আদায়ের তাওফিক দান করেন—এই কামনা রইল।
মন্তব্য করুন