হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
১ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৪৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় গাফিলতির কঠিন সতর্কবার্তা

নামাজ ছাড়লেই কী ভয়াবহ পরিণতি?

“নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।”

ঈমান আনার পর একজন মুমিনের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যপালনীয় ইবাদত হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, ক্ষমতাবান বা সাধারণ—প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের জন্য ফরজ করা হয়েছে।” (সুরা নিসা: ১০৩)

নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি বান্দা ও আল্লাহর মাঝে সবচেয়ে গভীর সম্পর্কের বন্ধন। মানুষ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা ভুলে তার রবের সামনে নিজেকে সোপর্দ করে। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়, সে যেন নিজেই আল্লাহর রহমত ও দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার থেকে নিজের জিম্মাদারি উঠিয়ে নেন।”

অর্থাৎ নামাজ ত্যাগকারী ব্যক্তি আল্লাহর আশ্রয় ও নিরাপত্তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, শিরকের পর সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেওয়া। হত্যা, ব্যভিচার, চুরি, লুণ্ঠন কিংবা মদ্যপানের মতো ভয়াবহ অপরাধের চেয়েও নামাজ পরিত্যাগের গুনাহ অনেক বেশি মারাত্মক বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। কারণ এসব গুনাহের মাধ্যমে মানুষ অন্যায় করে, কিন্তু নামাজ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সে সরাসরি তার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলে।

যদি কেউ নামাজকে ফরজ বলে বিশ্বাসই না করে এবং অস্বীকার করে, তাহলে ইসলামী শরিয়তের আলোকে সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যায়। আর যারা নামাজ ফরজ বলে মানে, কিন্তু অলসতা, উদাসীনতা কিংবা অবহেলার কারণে নামাজ পড়ে না, তারা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহগার ও ফাসেক।

আরো পড়ুন...  আমীর হামজার মৃত্যুবার্ষিকীতে মাগুরায় বৃত্তি ও দোয়া মাহফিল

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নামাজ পড়ে; কিন্তু নিজেদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন।” (সুরা মাউন: ৪-৫)

এ আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা নামাজ পড়ে ঠিকই, কিন্তু সময়মতো পড়ে না, অবহেলা করে, মনোযোগ ছাড়া পড়ে কিংবা দেরি করে আদায় করে। যদি শুধু অবহেলা ও দেরির কারণে এমন কঠিন সতর্কবার্তা আসে, তাহলে যারা একেবারেই নামাজ ছেড়ে দেয়, তাদের পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়।

হাদিসে বর্ণিত আছে, এক রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে স্বপ্নে কিছু ভয়াবহ শাস্তির দৃশ্য দেখানো হয়। তিনি দেখেন, একজন ব্যক্তি চিত হয়ে শুয়ে আছে। আরেকজন বড় একটি পাথর দিয়ে তার মাথা থেঁতলে দিচ্ছে। পাথরটি গড়িয়ে দূরে চলে গেলে সে আবার এনে একইভাবে আঘাত করছে। এ দৃশ্য বারবার চলতে থাকে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরে জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি এমন একজন, যে কোরআন শিখে তা ছেড়ে দিয়েছিল এবং ফরজ নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে যেত।

এই বর্ণনা প্রমাণ করে, নামাজকে হালকাভাবে নেওয়া বা অবহেলা করা শুধু একটি ছোট ভুল নয়; বরং এটি এমন একটি অপরাধ, যার ভয়াবহ শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় অপেক্ষা করছে।

আরও একটি হাদিসে এসেছে, কোনো বৈধ ওজর ছাড়া দুই ওয়াক্ত নামাজ একসঙ্গে আদায় করা কবিরা গুনাহ। অর্থাৎ সময়মতো নামাজ আদায় না করে পরে একত্রে পড়ে নেওয়ার অভ্যাসও ইসলামে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “ইসলাম ও কুফরের মাঝখানের পার্থক্য হলো নামাজ।” অর্থাৎ নামাজ ত্যাগ মানুষকে ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তার ঈমানই বিপদের মুখে পড়ে যায়।

আরো পড়ুন...  জগন্নাথপুরে রমজানের শুভেচ্ছা জানালেন রাজু আহমদ

আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, যার এক ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গেল, তার যেন পরিবার, ঘরবাড়ি ও সম্পদ সবকিছু হারিয়ে গেল। অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবনে নামাজের মূল্য এতটাই বেশি।

কিয়ামতের দিনও নামাজই হবে একজন মানুষের মুক্তির প্রধান মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নামাজের হেফাজত করবে, কিয়ামতের দিন নামাজ তার জন্য নূর, প্রমাণ ও নাজাতের কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি নামাজের গুরুত্ব দেবে না, তার জন্য নামাজ কোনো আলো বা সাহায্যের উৎস হবে না। বরং তার পরিণতি হবে ফেরাউন, হামান ও উবাই ইবনে খালাফের মতো আল্লাহর অবাধ্যদের সঙ্গে।

আজ আমাদের সমাজে অনেক মানুষ ব্যস্ততার অজুহাতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা দুনিয়াবি চিন্তায় ডুবে থেকে নামাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার মনে করে, পরে পড়ব, সময় হলে শুরু করব। কিন্তু মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই আজকের নামাজ কালকের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই।

একজন মুসলমানের জীবনে নামাজই হচ্ছে সফলতার প্রথম সোপান। নামাজ ঠিক থাকলে জীবনের অনেক কিছুই ঠিক হয়ে যায়। আর নামাজ নষ্ট হয়ে গেলে ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর, আমল ও জীবনও অন্ধকার হয়ে পড়ে।

তাই আসুন, আমরা সবাই সময়মতো নামাজ আদায়ের ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল হই। নিজেরা নামাজ পড়ি, পরিবারকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করি এবং সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই এ অভ্যাস গড়ে তুলি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে গুঞ্জন, ‘কিছুই চূড়ান্ত হয়নি’

আত্মসাতের অভিযোগ ৬০ লাখ টাকা, ফেরত চাইতেই প্রাণনাশের হুমকি

মোরেলগঞ্জে জাল সনদে পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে ধরা, জরিমানা ৪ জন

মোংলায় জাতীয় গোয়েন্ধা সংস্থার সংবাদে অবৈধ তেলের গোডাউনে র‌্যাবের অভিযান

মাগুরায় চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ

জগন্নাথপুরে নববর্ষের শুভেচ্ছা লাকির

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান

শ্রীপুরে বিজ্ঞান মেলা শুরু

ঝালকাঠি চত্বর উদ্বোধন

পানছড়িতে বিজ্ঞান উৎসব শুরু

১০

চীন সফরে যাচ্ছেন এমপি মনোয়ার হোসেন

১১

১৯ ক্লাবের অংশগ্রহণে স্মার্ট কিশোরী প্রতিযোগিতা

১২

৭ মাস পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন

১৩

নাতিকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে ট্রেনে কাটা পড়ে বৃদ্ধ নিহত

১৪

ঝড়ে নোয়াখালী রেলপথে অচলাবস্থা

১৫

ফুলবাড়ীতে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৬

৬নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হতে প্রস্তুত ফকরুল বিশ্বাস

১৭

তেল বিক্রিকে কেন্দ্র করে পানছড়িতে সংঘর্ষ, আহত ৩

১৮

মোরেলগঞ্জে ছাত্রদল নেতা আলি আজিমকে জড়িয়ে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ, প্রতিবাদে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

১৯

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিবি পুলিশের হেরোইন উদ্ধার, নারী গ্রেপ্তার

২০