
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের সময় বাঘসহ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের ভেতরে পুকুরসহ সাতটি উঁচু কিল্লা বা টাইগারটিলা নির্মাণ করেছে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ। বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এসব টিলা দুর্যোগকালে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের সময় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা সাগরের লোনা পানিতে প্লাবিত হয়। এতে অনেক সময় বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী মারা যায় বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বনের ভেতরে উঁচু স্থানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বন বিভাগ টাইগারটিলা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
প্রথম পর্যায়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের কটকা, কচিখালী, কোকিলমনি এবং চাঁদপাই রেঞ্জের হারবাড়িয়া ও চরাপুটিয়া এলাকায় মোট পাঁচটি টাইগারটিলা নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শরণখোলা রেঞ্জের সুপতি এবং চাঁদপাই রেঞ্জের মরাপশুর এলাকায় আরও দুটি টাইগারটিলা নির্মাণের কাজ গত ডিসেম্বর মাসে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিটি টাইগারটিলা নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। টিলাগুলোর সঙ্গে গভীর পুকুর খনন করা হয়েছে এবং খননকৃত মাটি দিয়েই ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার টিলা তৈরি করা হয়েছে। এসব পুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দুর্যোগের সময় বন্যপ্রাণীদের পানির চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে জলোচ্ছাসের সময় পুকুরের উঁচু পাড় ও টিলায় আশ্রয় নিতে পারবে প্রাণীরা।
সম্প্রতি কটকা ও সুপতি এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রশস্ত পুকুর ও তার পাশে সুবিশাল উঁচু টাইগারটিলা তৈরি করা হয়েছে, যা দুর্যোগকালে একসঙ্গে বহু বন্যপ্রাণীর আশ্রয় দিতে সক্ষম।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. মতিউর রহমান বলেন, “টাইগারটিলাগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে দুর্যোগের সময় বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী অনায়াসে উঁচু টিলায় উঠে আশ্রয় নিতে পারে।”
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন,
“ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের সময় সুন্দরবনের বড় অংশ লোনা পানিতে তলিয়ে যায়, ফলে বন্যপ্রাণী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণেই বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় টাইগারটিলা নির্মাণ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, গত দুই বছরে চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে সাতটি টাইগারটিলা নির্মাণ ও পুকুর খননের কাজ শেষ হয়েছে। তবে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের পুরো বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে আরও ২০টি টাইগারটিলা নির্মাণ করা প্রয়োজন।
বন বিভাগের এই উদ্যোগকে পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে এ ধরনের স্থায়ী আশ্রয় ব্যবস্থা বাঘসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন