
মিশরের রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে পবিত্র রমজান মাস এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন মিনারগুলো যেন নতুন আলোয় জেগে ওঠে। সেই আলোর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র আল-আজহার মসজিদ। এখানে ইফতার কেবল রোজা ভাঙার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিক সংহতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
প্রতিবছরের মতো এবারও আল-আজহারে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃহৎ পরিসরে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বাইতুজ যাকাত ওয়া সদকা ফাউন্ডেশন, যার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ড. আহমেদ তৈয়ব। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই ইফতারে অংশ নেন, যা রমজানের সন্ধ্যাগুলোকে পরিণত করে এক নীরব কিন্তু মহিমান্বিত সমাবেশে।
আসরের নামাজ শেষে শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে মসজিদের পূর্ব গেট দিয়ে প্রবেশ করেন। বিশাল সাদা টাইলস করা উঠানে সারিবদ্ধভাবে বসার ব্যবস্থা করা হয়। ঐতিহাসিক স্থাপত্য, কাঠের নকশাদার পর্দা এবং খোলা আকাশের নিচে এই আয়োজন এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। নারীদের জন্য রয়েছে পৃথক পরিসর, যেখানে তারা ইফতার ও নামাজ আদায় করেন স্বাচ্ছন্দ্যে।
প্রায় ১২০টি দেশের শিক্ষার্থী এখানে সমবেত হন। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, সুদানসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত তরুণরা একই চত্বরে বসে ইফতার করেন। বাংলাদেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন এই আয়োজনে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও পোশাকের বৈচিত্র্য থাকলেও ইমানের বন্ধনে সবাই একসূত্রে আবদ্ধ—এখানে জাতীয়তার সীমারেখা মুছে গিয়ে এক উম্মাহর পরিচয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইফতারের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, নেই কোলাহল। আজানের প্রায় পনেরো মিনিট আগে এক কারী কুরআন তেলাওয়াত শুরু করেন। তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠ প্রাঙ্গণে আধ্যাত্মিক আবেশ ছড়িয়ে দেয়। মাগরিবের আজান ধ্বনিত হলে শিক্ষার্থীরা খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার সম্পন্ন করে দ্রুত নামাজে দাঁড়ান। সরল এই আয়োজনেই ধরা পড়ে রমজানের প্রকৃত সৌন্দর্য।
নামাজ শেষে পরিবেশন করা হয় জুস, পানি, ভাত, রুটি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও কোপ্তা। জাঁকজমক কম হলেও তৃপ্তি গভীর। ইফতারের পর কেউ তারাবির প্রস্তুতি নেন, কেউ নীরবে ইবাদতে মগ্ন থাকেন, আবার কেউ সহপাঠীদের সঙ্গে মৃদু আলাপে সময় কাটান।
আল-আজহারের এই প্রতিদিনের ইফতার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না, বরং সম্মিলিত মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বিশ্ব যত বিভক্তই হোক, ইমানের বন্ধন এখানে অটুট ও অখণ্ড।
মন্তব্য করুন