বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘ভোট কারচুপি’ শব্দটি বহু আলোচিত। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে দৃশ্যমান অনিয়মই শেষ কথা নয়; বরং ক্ষমতার চূড়ান্ত নির্ধারণ ঘটে আরও গভীর ও অদৃশ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের (Al-Azhar University) শিক্ষার্থী ও কলামিস্ট জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘ডিপ স্টেট’ ধারণার প্রভাব তুলে ধরেছেন।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোট কাটাছেঁড়া বা নির্বাচনের দিন অনিয়ম—যেমন কেন্দ্র দখল, জাল ভোট বা ফল পরিবর্তন—নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয় আরও আগে—মনোনয়ন বাছাই, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, এমনকি ক্ষমতা হস্তান্তরের অঘোষিত অনুমোদনের স্তরে। ফলে নির্বাচন একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হলেও সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে নেওয়া থাকে অন্যত্র।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘ডিপ স্টেট’ ধারণার উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচিত এই ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের ভেতরে এমন এক অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর ক্ষমতাকাঠামো থাকে, যা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। যুক্তরাষ্ট্রে বিদায়ী ভাষণে প্রেসিডেন্ট Dwight D. Eisenhower যে “Military-Industrial Complex”-এর কথা বলেছিলেন, কিংবা তুরস্কে আলোচিত ‘ডেরিন দেভলেত’—এসব উদাহরণ একই বাস্তবতার ভিন্ন রূপ বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও লেখক চারটি স্তম্ভের কথা বলেছেন—রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অংশ, অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী, বর্ণনানিয়ন্ত্রণকারী মিডিয়া শক্তি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্বার্থ। তার মতে, এই স্তম্ভগুলোর সম্মিলিত আস্থা ছাড়া কেবল গণভোটের জোরে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয় হলেও তা এককভাবে যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষণে ইসলামভিত্তিক রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। লেখকের দাবি, আদর্শিকভাবে কঠোর বা অ-আলোচনাযোগ্য নৈতিক অবস্থান অনেক সময় ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। ফলে সরাসরি ধর্মীয় পরিচয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচেষ্টা নানা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। তবে তিনি ইসলামকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন; বরং মূল্যবোধনির্ভর, কর্মমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
লেখাটির উপসংহারে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে—গণতন্ত্র কি কেবল জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, নাকি তা নির্দিষ্ট কাঠামোর অনুমোদিত ইচ্ছার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? লেখকের মতে, যতদিন অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব থাকবে, ততদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটবে মূলত তাদের মধ্যেই, যারা সেই কাঠামোর সঙ্গে সহাবস্থান করতে সক্ষম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন আলোচনা বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও ক্ষমতার গতিশীলতা নিয়ে নতুন বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে।
মন্তব্য করুন