রনী আহম্মেদ, কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি
২২ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আনুষ্ঠানিকতায় হারাচ্ছে সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য

সময়ের প্রাণবন্ত ও আনন্দঘন সরস্বতী পূজা এখন আর আগের মতো নেই। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সামাজিক উৎসবের আবহ হারিয়ে বর্তমানে অনেক জায়গায় এই পূজা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কোটালীপাড়া উপজেলার বিভিন্ন সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে এবং প্রবীণ গুণীজন ও সুধীজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের মতে, দুই থেকে তিন দশক আগেও সরস্বতী পূজা ছিল একটি সর্বজনীন উৎসব। পূজার প্রস্তুতি শুরু হতো প্রায় এক মাস আগে। প্রতিমা বায়না, পুরোহিত ঠিক করা, চাঁদা তোলা এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূজার নিমন্ত্রণ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হতো উৎসবের আবহ। কোটালীপাড়ার গোপালগঞ্জ কালিবাড়ীসহ বিভিন্ন মন্দিরে তখন থেকেই চলত ব্যস্ত প্রস্তুতি।

পূজার তিন-চার দিন আগে থেকেই এলাকায় সাজ সাজ রব পড়ে যেত। বাঁশ দিয়ে গেট বানানো, সামিয়ানা টানানো, আলো ও মাইক বসানো—সব কাজে অংশ নিতেন স্থানীয় তরুণ ও প্রবীণরা। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলত সাজসজ্জার কাজ ও পুরোনো বাংলা গানের আসর। ঘরে ঘরে তৈরি হতো মিষ্টি দই, চিঁড়ার মোয়া, মুড়ির মোয়া ও খই, যার গন্ধেই বোঝা যেত পূজা আসন্ন।

আরো পড়ুন...  গোপালগঞ্জে হামের আতঙ্ক, হাসপাতালে ৪৩ শিশু, মৃত্যু ১

পূজার দিন ভোরে ফুল, বেলপাতা, দূর্বা ও আম্রপল্লব সংগ্রহ করে নদীর ঘাটে স্নান ছিল নিয়মিত চিত্র। নতুন পোশাকে শিক্ষার্থীরা মন্দিরে গিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিত। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে দেবীর কাছে বিদ্যার আশীর্বাদ প্রার্থনা করত তারা। সন্ধ্যায় আরতি, ঢাকের তালে নৃত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মন্দির প্রাঙ্গণকে করে তুলত মুখর।

পূজার পরদিন খিচুড়ি উৎসব এবং তৃতীয় দিনে চিনি-বাতাসা বিতরণ ছিল এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব রীতির মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল সামাজিক বন্ধন ও ধর্মীয় ঐক্য।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে অনেক জায়গায় পূজার মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে ডিজে গান ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে মেতে উঠছে এক শ্রেণির তরুণ-তরুণী। ফলে সরস্বতী পূজার ইতিহাস ও শিক্ষামূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

এ বিষয়ে উত্তর কোটালীপাড়া ভাঙ্গারহাট কাজী মন্টু মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ললিত চন্দ্র বৈদ্য বলেন,

“আমাদের ছোটবেলায় যেভাবে স্কুল, কলেজ ও গ্রামগঞ্জে জাঁকজমকপূর্ণ ও শালীনভাবে সরস্বতী পূজা হতো, এখন তা আর দেখা যায় না। বর্তমানে এটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। আমরা চাই, আগের মতো সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে সরস্বতী পূজা উদযাপনের সুযোগ আবার ফিরে আসুক।”

আরো পড়ুন...  দুবাই পালানোর সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার

স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মনে করছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও জীবন্ত করে তোলা সম্ভব। নচেৎ সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে এক সময়ের প্রাণের উৎসব—সরস্বতী পূজা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যশোর ৫নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী আরিফুল কামাল লাইট

কক্সবাজার মডেল প্রেসক্লাবের ঈদ পুনর্মিলনী ও অভিষেক অনুষ্ঠিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কুরিয়ারে ২২ কেজি গাঁজাসহ যুবক আটক

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ‘এ-ইউনিট’ ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন

টেকনাফে মুরগির খামার থেকে ৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

হিলিতে নিখোঁজ মেহের আলীকে উদ্ধারের দাবিতে সড়ক অবরোধ

রাজশাহীতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ

গাবুরায় অভিযোজন কৃষি প্রশিক্ষণ

নারী আসনে মনোনয়ন নিলেন রুমা

গলাচিপায় জমি বিতর্কে উত্তেজনা

১০

ভ্যানচালককে পিটিয়ে হত্যা

১১

মোরেলগঞ্জে বিজ্ঞান মেলার সমাপনী

১২

কুলিয়ারচরে মামলা পরবর্তী হুমকির অভিযোগ

১৩

কুলিয়ারচরে কৃষকের বাড়িতে হামলা, আহত ৫

১৪

বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবস আজ

১৫

গৌরীপুরে নববর্ষ উদযাপনে প্রস্তুতি সভা

১৬

নলডাঙ্গায় দুই দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন

১৭

সেনবাগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান

১৮

গৌরীপুরে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের প্রস্তুতি সভা

১৯

গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

২০