জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কায়রোতে মেসহারাতির ঐতিহ্য অটুট

রমজানের সেহরির সময় মানুষকে জাগিয়ে তোলার প্রাচীন ঐতিহ্য ‘মেসহারাতি’ আজও টিকে আছে মিশরের রাজধানী কায়রো-এর পুরনো অলিগলিতে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও শতাব্দীপ্রাচীন এই সংস্কৃতি রমজানের আধ্যাত্মিক আবহকে জীবন্ত রাখছে।

রমজানের রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ঢাকের মৃদু শব্দ ভেসে আসে, তখন পুরনো কায়রোর ফাতেমি যুগের স্থাপত্যঘেরা সরু পথঘাট যেন ইতিহাসের কথা বলে ওঠে। হাতে ছোট ঢাক, পরনে ঐতিহ্যবাহী গালাবিয়া—এভাবেই মেসহারাতিরা সেহরির আগে পাড়া-মহল্লা ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় পরিচিত আহ্বান—“ইয়া নায়েম, ওয়াহহিদুদ দায়েম”—যা রমজানের আধ্যাত্মিক আবহকে গভীর করে তোলে।

ইতিহাসবিদদের মতে, সেহরির জন্য মানুষকে জাগানোর প্রথা ইসলামের প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত। বর্ণনায় উল্লেখ আছে, সাহাবি আনবাসা ইবনুল আব্বাস (রা.)-কে প্রথম দিককার মুসাহহারাতি হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে মিশরে এই প্রথা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ফাতেমি আমলে। খলিফা হাকেম বি আমরিল্লাহ (১০০৪ খ্রি.) সৈন্যদের নির্দেশ দেন রাতের বেলায় ঘরে ঘরে কড়া নেড়ে মানুষকে জাগাতে। সেখান থেকেই সংগঠিতভাবে মেসহারাতির যাত্রা শুরু।

মামলুক যুগে এসে এ ঐতিহ্য আরও নান্দনিকতা লাভ করে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ইবন নুকতাহ নামে এক ব্যক্তি সুলতান আল-নাসের মুহাম্মদ-এর ব্যক্তিগত মুসাহহির ছিলেন। এ সময় ঢাক-তবলার তাল, সুরেলা নাশিদ ও ছন্দময় হাঁক প্রথাটিকে সাংস্কৃতিক মর্যাদা দেয়।

আরো পড়ুন...  সত্যি বলতে ইরানের তেল নেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য: ডোনাল্ড ট্রাম্প

অটোমান আমলে মেসহারাতি কায়রোর সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। তারা শুধু মানুষকে জাগাতেন না; অনেক সময় বাসিন্দাদের নাম ধরে ডাকতেন, তাদের জন্য দোয়া করতেন এবং পাড়াভিত্তিক এক সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতেন।

বর্তমানে মাইক্রোফোন, লাউডস্পিকার ও মোবাইল অ্যাপ সেহরির ঘোষণা দিলেও পুরনো কায়রোর অনেক এলাকায় এখনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বহাল রয়েছে। মেসহারাতির পোশাক-পরিচ্ছদও এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ঢিলেঢালা গালাবিয়া, মাথায় টাকিয়া বা পাগড়ি এবং হাতে ছোট ড্রাম তাকে আলাদা পরিচয় দেয়।

এ কাজ মূলত সেবামূলক। পাড়া-প্রতিবেশীরা রমজান শেষে খেজুর, খাবার বা সামান্য অর্থ দিয়ে সম্মান জানায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পেশার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবেই বিবেচিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগেও মেসহারাতির আবেদন অমলিন থাকার কারণ হলো এর মানবিক স্পর্শ। এটি শুধু জাগানোর মাধ্যম নয়; বরং রমজানের স্মৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও সম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতীক। শতাব্দী পেরিয়ে আজও কায়রোর রমজান রাত মেসহারাতির ঢাকের তালে ইতিহাস ও বর্তমানকে এক সুতোয় গেঁথে রাখছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যশোর ৫নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী আরিফুল কামাল লাইট

কক্সবাজার মডেল প্রেসক্লাবের ঈদ পুনর্মিলনী ও অভিষেক অনুষ্ঠিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কুরিয়ারে ২২ কেজি গাঁজাসহ যুবক আটক

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ‘এ-ইউনিট’ ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন

টেকনাফে মুরগির খামার থেকে ৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

হিলিতে নিখোঁজ মেহের আলীকে উদ্ধারের দাবিতে সড়ক অবরোধ

রাজশাহীতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ

গাবুরায় অভিযোজন কৃষি প্রশিক্ষণ

নারী আসনে মনোনয়ন নিলেন রুমা

গলাচিপায় জমি বিতর্কে উত্তেজনা

১০

ভ্যানচালককে পিটিয়ে হত্যা

১১

মোরেলগঞ্জে বিজ্ঞান মেলার সমাপনী

১২

কুলিয়ারচরে মামলা পরবর্তী হুমকির অভিযোগ

১৩

কুলিয়ারচরে কৃষকের বাড়িতে হামলা, আহত ৫

১৪

বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবস আজ

১৫

গৌরীপুরে নববর্ষ উদযাপনে প্রস্তুতি সভা

১৬

নলডাঙ্গায় দুই দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন

১৭

সেনবাগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান

১৮

গৌরীপুরে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের প্রস্তুতি সভা

১৯

গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

২০