যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জের হানুয়ার গ্রামে সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত আব্দুস সালাম গাজী (৪৫) অবশেষে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা ও উদ্বেগ। দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মার্চ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আব্দুস সালাম প্রতিদিনের মতো হানুয়ার বটতলা মোড়ে তাঁর সাইকেল-রিকশা গ্যারেজে কাজ করছিলেন। কাজের ফাঁকে তিনি পাশের লিটনের চায়ের দোকানে বসেছিলেন। এ সময় হঠাৎ প্রতিবেশী জমসেদ ও সিজার গাজীর ছেলেরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র, বিশেষ করে গরু জবাইয়ের ছুরি নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা আব্দুস সালামের গলায় পরপর কয়েকটি কোপ দেয়।
এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন ব্যাগেরআলী পাড়ার ওমেদ (৫২), তাকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় আব্দুল মজিদ (৩৬) সরাসরি কোপ দেয়, আর তার সহযোগীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অন্যদের বাধা দেয়, যাতে কেউ আহতদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারে।
গুরুতর আহত অবস্থায় আব্দুস সালামকে প্রথমে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আরও দুটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং শেষপর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ মার্চ ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অপর আহত ওমেদ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে বাড়িতে রয়েছেন।
আব্দুস সালামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে হানুয়ার বটতলা এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
সেদিন বাদ এশা হানুয়ার প্রধান মসজিদে আব্দুস সালামের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহস্রাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন আগে আব্দুস সালামের পরিবারের জমি দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। গ্রামবাসীর অভিযোগ, এ ঘটনায় একটি প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকতে পারে এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবেই হামলাটি চালানো হয়েছে।
নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, মামলার পর থেকেই তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছেন। আব্দুস সালামের ভাইপো রমজান বলেন, “আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমার চাচার হত্যার সঠিক বিচার চাই এবং আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
এ ঘটনায় পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
এ হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন