
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট দুধকুমার নদীর ওপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির পাটাতন ভেঙে পড়ায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত বোঝাই একটি ট্রাক সেতুতে উঠতেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফলে সোনাহাট স্থলবন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে সোনাহাট স্থলবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় ইট বোঝাই একটি ট্রাক সেতুর স্টিল কাঠামোর ওপর উঠলে অতিরিক্ত ওজনের চাপ সহ্য করতে না পেরে সেতুর একটি পাটাতন ভেঙে যায়। এতে ট্রাকটির একটি চাকা নিচে নেমে গিয়ে আটকে পড়ে। সেতুটির সর্বোচ্চ লোড ধারণ ক্ষমতা যেখানে ১০ টন, সেখানে ট্রাকটি প্রায় ৩৯ টন ইট বহন করছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার পরপরই সেতুর দুই প্রান্তে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়। বন্ধ হয়ে যায় বাস, ট্রাক, পিকআপসহ সব ধরনের যান চলাচল। জরুরি প্রয়োজনে অনেক যাত্রীকে নৌকায় করে দুধকুমার নদী পার হতে দেখা গেছে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোনাহাট সেতুটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর বিভিন্ন পাটাতন আগে থেকেই বেঁকে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। একাধিকবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সংস্কার বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন মানুষ ও পণ্যবাহী যান চলাচল করছিল।
বিশেষ করে সোনাহাট স্থলবন্দর এই অঞ্চলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করে থাকে। সেতুটি বন্ধ থাকলে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা দ্রুত সেতু মেরামত অথবা বিকল্প সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৭ সালে লালমনিরহাট থেকে ভারতের গৌহাটি পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। এরই অংশ হিসেবে দুধকুমার নদীর ওপর প্রায় ১২০০ ফুট দীর্ঘ সোনাহাট রেলসেতুটি নির্মিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সেতুর একটি অংশ ধ্বংস করা হয়। পরবর্তীতে মেরামতের মাধ্যমে এটি সড়ক যোগাযোগের উপযোগী করা হয় এবং দক্ষিণ ভূরুঙ্গামারীর তিন ইউনিয়ন, কচাকাটা ও মাদারগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়।
কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সেতুটির ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও সংশ্লিষ্ট ট্রাকটি প্রায় ৩৯ টন মাল বহন করছিল। অতিরিক্ত লোডের কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ট্রাক মালিক ও ইট ক্রয়কারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
ভূরুঙ্গামারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজিম উদ্দিন জানান, ওভারলোড পরিবহনের ক্ষেত্রে সরাসরি ফৌজদারি মামলা না হলেও জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত সেতু সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ আর না ঘটে।
মন্তব্য করুন