
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও বিদেশি পণ্যের ঝলমলে আয়োজনের মধ্যেও আলাদা করে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। রঙিন প্যাভিলিয়ন আর কৃত্রিম উপকরণের ভিড়েও মাটির তৈরি গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রীর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ প্রমাণ করছে—শত আধুনিকতার মাঝেও মাটির জিনিসের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
মেলার মূল ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্ণারে অবস্থিত **শাহপরান মৃৎশিল্প** প্যাভিলিয়নটি বর্তমানে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্যাভিলিয়নজুড়ে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে মাটির তৈরি প্লেট, বিরিয়ানির থালা, কাপ-পিরিচ, গ্লাস, ডিনার সেট, হাঁড়ি, গামলা, ফুলদানি, ব্যাংক, ওয়ালমেট, মোমদানি, ল্যাম্প, পুতুল, শোপিসসহ নানা ধরনের গিফট আইটেম। নানান রঙ, নকশা ও নান্দনিক আকৃতির এসব পণ্য মেলায় আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্যাভিলিয়নে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই রয়েছে। কেউ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী কিনছেন, কেউ আবার ঘর সাজানোর জন্য বেছে নিচ্ছেন মাটির শৌখিন উপকরণ। একসময় গ্রামবাংলার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির জিনিসপত্র। সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের দাপটে সেগুলোর ব্যবহার কমে গেলেও, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও নান্দনিকতার কারণে আবারও মাটির তৈজসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
মেলায় মাটির তৈরি কাপ-পিরিচ প্রতি পিস ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, থালা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, ফুলদানি ১২০ থেকে ২০০ টাকা, ব্যাংক ৪০ থেকে ২০০ টাকা, ওয়ালমেট ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং হাঁড়ি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে এসব পণ্য পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন।
মাটির পণ্য কিনতে আসা গৃহবধূ হাসিনা আক্তার বলেন, আধুনিকতার কারণে মাটির জিনিসের ব্যবহার কমে গেলেও এগুলো প্লাস্টিক বা মেলামাইনের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। পাশাপাশি দেখতে সুন্দর এবং দামও সাশ্রয়ী হওয়ায় তিনি মাটির তৈজসপত্র কিনছেন।
অন্যদিকে, স্কুলশিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানান, ঘর সাজাতে রুচিবোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অল্প খরচে মাটির পুতুল, ফুলদানি বা ল্যাম্প ব্যবহার করে ঘরের পরিবেশ সহজেই আকর্ষণীয় করা যায়।
শাহপরান মৃৎশিল্পের স্বত্বাধিকারী শাহপরান জানান, তিনি দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির তৈরি গৃহস্থালি ও শৌখিন পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। তার তৈরি পণ্যগুলো প্রায় ৮৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়, ফলে এগুলো সাধারণ কাচের সামগ্রীর চেয়েও বেশি টেকসই। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে। মেলার শুরুতে বিক্রি কিছুটা কম থাকলেও এখন ক্রেতাদের ভিড় ও বিক্রি দুটোই বাড়ছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মৃৎশিল্পের এই উপস্থিতি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন