
দেশে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে। সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দাম দিয়েও অনেক জায়গায় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বিইআরসির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। নতুন এই দাম গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
গতকাল বিকেলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন দর ঘোষণা করেন। এ সময় কমিশনের সদস্য মো. মিজানুর রহমান, মো. আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারওয়ার উপস্থিত ছিলেন।
দাম ঘোষণার পর বাজারে চলমান সংকট নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘খুচরা পর্যায়ে আমাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। এ বিষয়ে আমরা ভোক্তা অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি এবং অভিযান জোরদার করার অনুরোধ জানিয়েছি। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা ঠিক যে কিছু এলপিজি বহনকারী জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানিতে সমস্যা হয়েছে। তাই ব্যবসায়ীদের মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে সিঙ্গাপুরসহ বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
এলপিজি সংকটের প্রেক্ষাপটে গতকাল বিকেলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন জ্বালানি সচিব। বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি, জাহাজ সংকট এবং কিছু কার্গোর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানিতে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও গত নভেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।
বৈঠকে লোয়াব নেতৃবৃন্দ জানান, বিইআরসি জানুয়ারি মাসে দাম বাড়াতে পারে—এমন ধারণা থেকে খুচরা বিক্রেতারা আগেভাগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার, ফ্রেইট চার্জ ও বিনিময় হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা, আমদানির ক্ষেত্রে এলসি সহজীকরণ, সংকটকালীন সময়ে ফাস্ট-ট্র্যাক অনুমোদন, লাইসেন্স ফি ও ভ্যাট যৌক্তিকীকরণ এবং বন্দরে এলপিজিবাহী জাহাজের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা।
লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘যে পরিমাণ এলপিজি ইতোমধ্যে আমদানি হয়েছে, তা বাজারজাত করা হলে সংকট থাকার কথা নয়। সমস্যা মূলত ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে।’
এদিকে লোয়াবের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। এতে ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। রাজধানীর গ্রিনরোড, কাঁঠালবাগান, মগবাজার, নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে এলপিজি সিলিন্ডার নেই। কোথাও পাওয়া গেলেও তা বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত দামের অনেক বেশি দামে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো রসিদও দেওয়া হচ্ছে না।
গ্রিনরোড এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন নয়ন জানান, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে সাড়ে ৬০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী নিয়ামুল করিম বলেন, ‘ব্যবসা চালু রাখতে বাধ্য হয়ে ৯০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি।’
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ডিলার ও সাব-ডিলার পর্যায়েই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। রসিদ চাইলে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যই দেওয়া হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই তারা বেশি দামে বিক্রি করছেন। তাদের দাবি, সরকার যদি ডিলার পর্যায়ে কঠোর অভিযান চালায়, তাহলে বাজারে এই অরাজকতা অনেকটাই কমবে।
মন্তব্য করুন