জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতার বন্দুকের নীচে বাংলাদেশ

বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা আর ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। এই দেশ কাগজে-কলমে স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে জনগণ যেন বন্দি। পতাকা আছে, সংবিধান আছে, নির্বাচনও আছে—কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই। অধিকার চাইতে গেলেই অনেককে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।

এটি কোনো হঠাৎ বিপর্যয় নয়; বরং একটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল। জনগণ আগে যেমন অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, আজও তেমনি বঞ্চিত—বরং এখন সেই বঞ্চনা আরও নিষ্ঠুর, আরও রক্তমাখা। তখন নিপীড়ন ছিল নীরব, এখন তা প্রকাশ্য—নির্দ্বিধায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায়।

স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে মুক্তির আশায় ছাত্র-জনতা যে রক্ত ঢেলেছিল, সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই ক্ষমতার চেয়ারে বসানো হয়েছিল একজন শিক্ষককে। আশা ছিল—একজন শিক্ষিত, সচেতন নাগরিক রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে রাজনীতি মানবিক হবে। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ার প্রমাণ করল, এটি শুধু মানুষ বদলায় না—মানুষকেই গ্রাস করে।

জাতির রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় বসে সেই রক্তের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা—এটাই আজকের রাজনীতির নগ্ন বাস্তবতা। ভাইয়ের রক্তের দাবি নিয়ে কেউ বিচার চাইলে রাষ্ট্র বলে—লাশ নিয়ে যাও। আর যদি প্রতিবাদ থামে না, তবে গুলি। এরপর রাষ্ট্রযন্ত্র নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করে—“আমরা কিছুই করিনি।” এই অস্বীকারই যেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিয়মিত ভাষা হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন...  চায়ের স্বস্তির আড়ালে চা শ্রমিকের করুণ জীবন

ক্ষমতা পাওয়ার আগে আদর্শ থাকে, ক্ষমতা পাওয়ার পর দায়িত্ব হারিয়ে যায়। কমিটি গঠনের আগে ও পরে একই মুখ থাকলেও, একই বিবেক আর থাকে না। নেতৃত্ব বদলায় না—বদলে যায় মানুষের মূল্য। তখন নাগরিক আর মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে সংখ্যা, বোঝা, অথবা টার্গেট।

সাম্প্রতিক সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের হাদী হত্যার বিচার চাওয়া হলে জবাব এসেছে গুলিতে। ছাত্রদের ওপর পুলিশ বাহিনী চালিয়েছে নির্মম লাঠিচার্জ। সংবাদকর্মীকেও টার্গেট করে মারধর করা হয়েছে, কারণ সে সত্য দেখাতে চেয়েছিল। আজ সত্য যেন অপরাধ, আর সত্য বলা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।

এই রাষ্ট্রে গুলি এখন শুধু প্রতিবাদকারীর শরীরে ঢোকে না—এটি সমাজের বিবেককেও ক্ষতবিক্ষত করে। লাঠি শুধু পিঠে পড়ে না—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কণ্ঠও ভেঙে দেয়। আর রাষ্ট্র যখন বলে “আমরা জানি না”—তখন সেই না-জানাই সবচেয়ে ভয়ংকর প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি নয়, রাজনীতি নয়—সবচেয়ে বড় সংকট নৈতিকতার। রাষ্ট্র নাগরিককে শত্রু ভাবছে, আর নাগরিক রাষ্ট্রকে ভয় পাচ্ছে। এই সম্পর্ক কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—যখন গুলি চলছিল, তখন রাষ্ট্র কাদের পক্ষে ছিল? আর যখন মানুষ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল, তখন ক্ষমতা কাদের রক্ষা করছিল?

আরো পড়ুন...  ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতি? কোন যুদ্ধবিরতি?

এই প্রশ্নের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ কেবল নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থেকে যাবে—যেখানে স্বাধীনতা স্মৃতিতে আছে, বাস্তবে নয়।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যশোর ৫নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী আরিফুল কামাল লাইট

কক্সবাজার মডেল প্রেসক্লাবের ঈদ পুনর্মিলনী ও অভিষেক অনুষ্ঠিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কুরিয়ারে ২২ কেজি গাঁজাসহ যুবক আটক

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ‘এ-ইউনিট’ ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন

টেকনাফে মুরগির খামার থেকে ৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

হিলিতে নিখোঁজ মেহের আলীকে উদ্ধারের দাবিতে সড়ক অবরোধ

রাজশাহীতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ

গাবুরায় অভিযোজন কৃষি প্রশিক্ষণ

নারী আসনে মনোনয়ন নিলেন রুমা

গলাচিপায় জমি বিতর্কে উত্তেজনা

১০

ভ্যানচালককে পিটিয়ে হত্যা

১১

মোরেলগঞ্জে বিজ্ঞান মেলার সমাপনী

১২

কুলিয়ারচরে মামলা পরবর্তী হুমকির অভিযোগ

১৩

কুলিয়ারচরে কৃষকের বাড়িতে হামলা, আহত ৫

১৪

বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবস আজ

১৫

গৌরীপুরে নববর্ষ উদযাপনে প্রস্তুতি সভা

১৬

নলডাঙ্গায় দুই দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন

১৭

সেনবাগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান

১৮

গৌরীপুরে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের প্রস্তুতি সভা

১৯

গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

২০