ইতিহাস ডেস্ক
৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ৬:৩৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
চারদিক

বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি

বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি

বাংলাদেশের প্রকৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার সবুজ বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী। নদী–খাল, হাওর–বাঁওড় আর জঙ্গল মিলিয়ে একসময় আমাদের জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস ছিল সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। কিন্তু গত কয়েক দশকে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে। উন্নয়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে প্রকৃতির ওপর যে আঘাত নেমে এসেছে, তা আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গাছ কাটা যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ।

বন উজাড়ের গতি এতটাই দ্রুত যে, বহু এলাকায় আগের সবুজের কোনো চিহ্নই আর নেই। এই ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বন্যপ্রাণী, যাদের আবাসস্থল প্রতিদিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল—রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন মানুষের আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শিকার। নতুন রাস্তা, রিসোর্ট, কৃষিজমি, গার্মেন্টস বা ইটভাটা নির্মাণের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা যেন এক ধরনের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। মানুষ ভাবে, একটি গাছ কেটে কীই বা হবে? কিন্তু প্রতিদিন যখন হাজার হাজার গাছ কাটা পড়ে, তখন শুধু বন নয়—ভেঙে পড়ে পুরো ইকোসিস্টেম।

বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জীবন্ত পৃথিবী, যেখানে প্রাণী, পাখি, পোকামাকড়, মাটি ও পানি মিলেই গড়ে তোলে একটি সূক্ষ্ম জীবনচক্র। এই জীবনচক্র ভেঙে গেলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

আরো পড়ুন...  সাংবাদিকতা যখন কার্ড আর ফেসবুক লাইভের অভিনয়ে বন্দি

অনেকে মনে করেন, বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হলেও মানুষের জীবনে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। একটি বনের প্রতিটি প্রাণীরই নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কোনো পাখি ফলের বীজ ছড়িয়ে বন পুনর্জন্মে সাহায্য করে, কোনো পোকা মৃতপাতা পচিয়ে মাটিকে উর্বর করে। হরিণ ঘাস খেয়ে বনে আগুন লাগার ঝুঁকি কমায়, আর বড় শিকারি প্রাণী ছোট শিকারিদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। এই জীবচক্রের একটি অংশ নষ্ট হলেই পুরো ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না—একটি প্রজাতির বিলুপ্তি কীভাবে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, পানি, আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রভাবিত করে।

বন উজাড় ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির আরেকটি বড় কারণ অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার। বনরক্ষীদের সক্ষমতা সীমিত, অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি নেই—ফলে অপরাধীরা দণ্ডহীনতার সুযোগ নেয়। স্থানীয় মানুষ অনেক সময় দারিদ্র্যের চাপে শিকারে যুক্ত হলেও, প্রকৃত নিয়ন্ত্রক থাকে বড় গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক পাচারচক্র। সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আইন যতটা কঠোর, প্রয়োগ ততটাই দুর্বল।

তবে আশার দিকও আছে। পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক আন্দোলন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশবিষয়ক শিক্ষার প্রসার মানুষকে সচেতন করছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বনায়ন কর্মসূচি চালাচ্ছে, তরুণরা চারা রোপণ করছে, নদী ও বন রক্ষায় সোচ্চার হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, গবেষকরাও বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে কাজ করছেন। তবে এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং কঠোর নজরদারি। একদিন গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না; দরকার পরিচর্যা ও প্রাকৃতিক পুনর্জীবন নিশ্চিত করা।

আরো পড়ুন...  পাম্পে ‘তেল নেই’, গোপনে মজুত—জ্বালানি বাজারে কারসাজির অভিযোগ

বাংলাদেশের পরিবেশ বাঁচাতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত বন উজাড় বন্ধ করা। নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্মাণ ও শিল্পায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র কঠোরভাবে মানতে হবে। রিসোর্ট বা পর্যটনের নামে বন ধ্বংস বন্ধ করা জরুরি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে—কারণ তাদের জীবনমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর জন্য করিডোর তৈরি, সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইনের কারণে প্রাণহানি রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রকৃতি আমাদের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু তার সহনশীলতারও একটি সীমা আছে। আমরা যদি বনের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকি, একদিন প্রকৃতির প্রতিশোধ আমাদেরই মোকাবিলা করতে হবে। ঝড়, খরা, বন্যা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিই তার সতর্কবার্তা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে জানবে—একসময় এই দেশে ঘন বন ছিল, বাঘ ছিল, হাতি ছিল, পাখির কোলাহলে মুখর সকাল ছিল।

আরশী আক্তার সানী-
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গলাচিপার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক মিয়া অসুস্থ, দ্রুত সুস্থতা কামনায় রিপোর্টার্স ক্লাব

কুলিয়ারচরে ইউএনও’র মধ্যস্থতায় পারিবারিক বিরোধের অবসান, দম্পতির মুখে ফিরল হাসি

কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন

জাতীয় স্কার্ফ ও থ্রি বিডে ভূষিত হিলির কৃতি সন্তান মহিদুল ইসলাম

বিশ্বকাপ ফাইনালে নাটকীয় জয়, আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন স্পেন

ভেড়ামারায় যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত

চন্দনাইশ থানা পুলিশের অভিযানে ৫ আসামি গ্রেপ্তার

কমলগঞ্জে মনিপুরি গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ

সেনবাগে অপরাধ দমনে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান, ওসি আবদুর রহিমের নেতৃত্বে জোরদার তৎপরতা

মোংলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্য

১০

মোরেলগঞ্জে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ডাকবাংলো ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন

১১

লন্ডনে আল্লামা দুবাগী (রহ.)-এর ষষ্ঠ বার্ষিক ঈসালে সাওয়াব মাহফিল সম্পন্ন

১২

শ্রীপুরে জুলাই শহীদ ও আহতদের আর্থিক অনুদান, অসহায়দের মাঝে হুইলচেয়ার-ভ্যান-চাউল বিতরণ

১৩

মৌলভীবাজারে টিলাধসের ঝুঁকিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ

১৪

পানছড়িতে নিষিদ্ধ পিরানহা মাছ বিক্রি: ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা

১৫

কালিয়াকৈর পৌরসভার উদ্যোগে বন্যাকবলিত ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ

১৬

নড়াইলের লোহাগড়ায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৭

একই পরিবারের ১১ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর পাশে জেলা প্রশাসন, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও নতুন পোশাক বিতরণ

১৮

বড়লেখায় প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দুই যুবক গ্রেপ্তার

১৯

বাঁশখালীতে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে নগদ অর্থ ও টিন বিতরণ

২০