সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যে এমন কিছু দৃশ্য ও সংবাদ সামনে আসে, যা শুধু মনকে ভারাক্রান্তই করে না, বরং মানুষের মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মায়ের করুণ পরিণতির খবর ও ছবি দেখে অনেকের মতো আমিও স্তব্ধ হয়ে গেছি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মায়ের এমন নিঃসঙ্গ ও অসহায় অবস্থার চিত্র সত্যিই বেদনাদায়ক।
একজন মা সন্তানের জন্য কী ত্যাগ স্বীকার করেন, তা কোনো পরিমাপের মধ্যে আনা সম্ভব নয়। গর্ভধারণের কষ্ট থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালনের প্রতিটি ধাপে তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। রাত জেগে সন্তানের সেবা, নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার নিরন্তর সংগ্রাম—এসবই একজন মায়ের জীবনের বাস্তবতা। অথচ সেই মায়ের বার্ধক্যে সন্তানের দায়িত্ব কতটা থাকে—এই প্রশ্ন আজ সমাজের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, শাশুড়ি-বউমার দ্বন্দ্ব কিংবা দূরত্বের কারণে অনেক সময় বৃদ্ধ বাবা-মা অবহেলার শিকার হন বলে শোনা যায়। কিন্তু একজন জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কি কখনো পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে? নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ—সবকিছুই বলে, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব কখনোই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং সাহিত্য বারবার পিতা-মাতার মর্যাদা ও সেবার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। একজন মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও অবদান এমন এক বাস্তবতা, যা কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। ইতিহাসে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।
প্রশ্ন হলো, আধুনিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা কি মানুষকে মানবিক করে তোলে? একজন মানুষ বড় কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা শিক্ষিত হলেও যদি নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে সেই সাফল্যের মূল্য কতটুকু?
তবে এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—সামাজিক মাধ্যমে দেখা সব ঘটনা যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করা ঠিক নয়। কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ, পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা জানা না গেলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সঠিক নয়। ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো সত্য উদঘাটন।
তবুও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—যদি কোনো সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করে, তাহলে তা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। এমন ঘটনা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। তবে শুধু আইন দিয়ে মানবিকতা তৈরি করা যায় না। মানবিকতা গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও নৈতিক চর্চার মাধ্যমে। তাই পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আজ আমাদের নিজেদেরকেই প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই আমাদের মা-বাবার পাশে আছি? তাদের একাকীত্ব, কষ্ট ও প্রয়োজন বুঝতে পারছি? নাকি ব্যস্ততার অজুহাতে ধীরে ধীরে তাদের জীবনের প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছি?
একজন মা-বাবা সন্তানের কাছে কখনো বিলাসিতা চান না। তারা চান একটু ভালোবাসা, একটু সময় এবং কিছু আন্তরিকতা। জীবনের শেষ বয়সে এটাই তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।
পল্লবীর এই মর্মান্তিক ঘটনা যদি অবহেলার ফল হয়, তবে তা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়—এটি আমাদের পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ যে সমাজে মা-বাবা অবহেলিত হন, সেই সমাজের মানবিক ভিত্তিও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের মা-বাবা যেন কখনোই অবহেলা, নিঃসঙ্গতা বা অসহায়ত্বের শিকার না হন। কারণ পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কের বিকল্প থাকলেও, মা-বাবার কোনো বিকল্প নেই।
মন্তব্য করুন