চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের লাহারপুর তাঁতিপাড়ায় আরাধনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী গণেশ জননী পূজা। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে পালিত এই ব্যতিক্রমধর্মী পূজাটি এ বছর ১৪৩তম বারের মতো আয়োজন করা হয়েছে। পাঁচ দিনব্যাপী এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো লাহারপুর এলাকায় বিরাজ করছে আনন্দ, ভক্তি ও সম্প্রীতির আবহ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ থেকে লাহারপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিতভাবে গণেশ জননী পূজা পালন করে আসছেন। দীর্ঘ এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মও পূর্বপুরুষদের এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আগলে রেখেছে। বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে গণেশ জননী পূজার আয়োজন না থাকায়, লাহারপুরের এই পূজা দেশব্যাপী এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত।
দুর্গাপূজার মতোই এই পূজাকে কেন্দ্র করে লাহারপুর তাঁতিপাড়ায় সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। সরস্বতী পূজার পরদিন শনিবার রাত থেকে শুরু হয় গণেশ জননীর আরাধনা। পূজার পাশাপাশি বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা, যেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আগত পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মেলায় বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টান্ন ও গ্রামীণ পণ্যের দোকান বসেছে, যা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
পূজা উদযাপন কমিটির তথ্যমতে, রোববার সপ্তমী, সোমবার অষ্টমী, মঙ্গলবার নবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিয়মিত আরতি ও পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সোমবার অষ্টমীর দিনে সকাল ১০টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী পূজা অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ভক্তরা অঞ্জলি প্রদান করেন, মানত করেন এবং ভোগ নিবেদন করেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভক্তদের অংশগ্রহণে মন্দির প্রাঙ্গণ ছিল মুখরিত।
লাহারপুর গণেশ জননী মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী পরাশ চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক শ্রী সঞ্জয় কুমার দাস (অজয়) বলেন, “বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে গণেশ জননী পূজা অনুষ্ঠিত হয় না। শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের লাহারপুর তাঁতিপাড়াতেই শত বছরের এই ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে। আমরা সবাই মিলে এই পূজাকে ঘিরে ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছি।”
এই পূজাকে কেন্দ্র করে লাহারপুর এলাকায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলা ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে পূজা উদযাপন চলছে। শতবর্ষী এই গণেশ জননী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং লাহারপুরের মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত।
মন্তব্য করুন