
পুরান ঢাকার ওয়ারীতে জাল টাকা উদ্ধারের একটি অভিযান ঘিরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা—ডিবি তেজগাঁও বিভাগের ভেতরে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া অর্থ জব্দ তালিকায় দেখানো নিয়ে মতবিরোধ থেকে শুরু করে এক পর্যায়ে সোর্স অপহরণ, হোটেল কক্ষে আটকে রাখা, মারধর ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পর্যন্ত গড়িয়েছে ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ডিএমপিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে এবং গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
ডিবি সূত্র, সংশ্লিষ্ট থানার জিডি এবং পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, দিদারুল ইসলাম দিদার নামে এক সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ নভেম্বর ডিবির তেজগাঁও বিভাগের একটি দল পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে জাল টাকা উদ্ধারে অভিযান চালায়। অভিযানে ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল নোট, ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা নগদ অর্থ এবং টাকা গণনার মেশিন উদ্ধার করা হয়। এ সময় নূরুল হক ও সাইদুল আমিন নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানের সময় তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান অভিযান বন্ধ করে দলকে ফিরে আসার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সহকারী কমিশনার (এসি) তারেক সেকান্দার ওই নির্দেশকে ‘অবৈধ’ উল্লেখ করে অভিযান চালু রাখেন এবং আইন অনুযায়ী জব্দ তালিকা তৈরি করে মামলা দায়ের করেন।
অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধার হওয়া ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার মধ্যে মাত্র ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা জব্দ দেখাতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় অভিযানে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিসি রাকিব খানের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে। অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক ডিবি সদস্যের দাবি, অবৈধ নির্দেশ অমান্য করায় তারা পরবর্তীতে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির শিকার হন।
ঘটনার সূত্র ধরে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। অভিযানের সোর্স দিদারুল ইসলাম দিদারকে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে তুলে এনে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার একটি হোটেলে তিন দিন আটকে রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ডিবি তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে ওই হোটেলে আটক রাখেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কলের মাধ্যমে থানা পুলিশ হোটেল থেকে দিদারকে উদ্ধার করলেও পুনরায় তাকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, উদ্ধারের পর দিদারকে নির্যাতন করে উখিয়া থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পুলিশ সদর দপ্তরে দেওয়া অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। দিদারের স্ত্রী ও ছেলের একাধিক অডিও রেকর্ডেও সেই চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এদিকে অভিযানে উদ্ধার হওয়া টাকার একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগে ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান পাল্টা অভিযোগ করেছেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এসি তারেক সেকান্দার ও তার টিমের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগ তদন্তে ডিবির পক্ষ থেকে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত করছেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো অবৈধ আদেশ দেননি। অন্যদিকে এসি তারেক সেকান্দার দাবি করেছেন, তিনি আইন মেনেই জাল টাকা উদ্ধার ও মামলা দায়ের করেছেন এবং অবৈধ নির্দেশ মানেননি বলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে জানিয়েছে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তবে জাল টাকা উদ্ধারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে পুলিশের ভেতরের এই দ্বন্দ্ব বাহিনীর ভাবমূর্তি ও পেশাদারিত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মন্তব্য করুন