ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা ইউনিয়নের শেয়ালডাঙ্গী গ্রামে উচ্ছেদ আতঙ্কে মানবেতর জীবন যাপন করছে ১৭২টি ভূমিহীন পরিবার। প্রায় চার দশক ধরে সরকারি খাসজমিতে বসবাস করলেও আজ পর্যন্ত তারা জমির কোনো স্থায়ী বন্দোবস্ত পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্তের জন্য প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এসব অসহায় পরিবার।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল ওই খাসজমি দখলের উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে তাদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। কখনো মিথ্যা মামলা, আবার কখনো জোরপূর্বক উচ্ছেদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।
সোমবার দুপুরে সিডিএ’র সহযোগিতায় জগন্নাথপুর ভূমিহীন জনসংগঠনের উদ্যোগে সংগঠনটির মাঠে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগী ভূমিহীনরা। সভায় তারা জানান, বারবার উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও কোনো সুফল মিলছে না। বরং প্রভাবশালীদের চাপে প্রশাসন অনেক সময় নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে তাদের অভিযোগ।
ভূমিহীন আমেনা বেগম বলেন, “আমরা প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এই এলাকায় সরকারের প্রায় ৮২ একর খাস জমি রয়েছে। আমরা শুধু যেখানে বসবাস করছি সেই সামান্য জমিটুকুর বন্দোবস্ত চাই। প্রতিদিন উচ্ছেদের ভয়ে পরিবার নিয়ে ঘুমাতে পারি না। প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।”
আরেক ভূমিহীন রমজান আলী বলেন, “খাসজমির বন্দোবস্ত না থাকায় আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এতে শিশু ও শিক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনা করতে পারছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা অনেক মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। খুঁটি বসানো হলেও আজ পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া হয়নি। আধুনিক যুগেও অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে।”
ভূমিহীন রুকসা বেগম বলেন, “স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের মতো বাস্তুহারা মানুষকে বসবাসের জমির জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। হাজার হাজার একর সরকারি খাস জমি থাকলেও আমাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। সরকারি লোকজনের সদিচ্ছার অভাবে আজ আমাদের ঘর হারানোর ভয়।”
উপজেলা ভূমিহীন সংগঠনের সভাপ্রধান অবিনাশ রায় অভিযোগ করেন, একটি বেসরকারি কোম্পানি ওই খাসজমি থেকে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে সেখানে জুতা তৈরির কারখানা স্থাপন করতে চায়। এ উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ষড়যন্ত্র চলছে। সম্প্রতি এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে অবৈধভাবে সরকারি গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাঁর দাবি, প্রকৃত ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালীরাই খাসজমির বন্দোবস্ত পাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছবীর হোসেন বলেন, “সরকারি খাসজমিতে বসবাসরত কোনো ভূমিহীনকে কেউ উচ্ছেদের হুমকি দিলে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে দ্রুত খাসজমি বন্দোবস্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভূমিহীন পরিবারগুলোর দাবি, উচ্ছেদের ভয় থেকে মুক্ত হয়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য তারা শুধু সরকারের ন্যায্য সহায়তা ও সুবিচার চান।
মন্তব্য করুন