
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে শুরু হওয়া দীর্ঘ এক বছরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) এবং পররাষ্ট্র দপ্তর যৌথভাবে এই সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ডব্লিউএইচওর অংশীদারিত্বের অবসান ঘটল, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডব্লিউএইচওর কাঠামোগত দুর্বলতা, সংস্কারে ব্যর্থতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ ছিল। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে ডব্লিউএইচও অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করেছে, যার ফলে মহামারি দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু দেশের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ডব্লিউএইচও তাদের মূল লক্ষ্য ও নিরপেক্ষতা থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করেছে। সংস্থাটি অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি ডব্লিউএইচওতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান দিলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মার্কিন নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে দাবি করে হোয়াইট হাউস।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী কোনো সদস্য রাষ্ট্র ডব্লিউএইচও ছাড়তে চাইলে নির্দিষ্ট সময় আগে নোটিশ দেওয়া এবং সব বকেয়া অর্থ পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সেই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৭ কোটি ডলারের বেশি বকেয়া অনুদান রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানায়, ডব্লিউএইচওর বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এই অর্থ পরিশোধে তারা আইনগতভাবে বাধ্য নয়।
ডব্লিউএইচও ছাড়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বড় অর্থদাতা ও প্রভাবশালী দেশের সরে যাওয়া বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিচালিত টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ও জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, ডব্লিউএইচও থেকে সরে গেলেও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমবে না। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আঞ্চলিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও রোগ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকবে বলে জানানো হয়।
সব মিলিয়ে, ডব্লিউএইচও থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বিদায় শুধু একটি সংস্থার সদস্যপদ পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মন্তব্য করুন