মিশরের রাজধানী কায়রো-তে পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদারে বৈশ্বিক সংলাপের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-এর শরিয়া ও আইন অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে পরিবারকে ঘিরে আধুনিক বিশ্বের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়।
“একটি সুসংহত সমাজ গঠন, আধুনিক চ্যালেঞ্জে পরিবারকে রক্ষা” শীর্ষক এ সম্মেলন ১৮–১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নাসর সিটির আল-আজহার কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি আয়োজিত হয় ড. আহমদ আত-তায়্যেব-এর পৃষ্ঠপোষকতায়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেন মিশরের ওয়াকফ ও ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি-সহ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা আলেম, আইনবিদ ও গবেষকরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সামিনা নাজ, যিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে পরিবারকে সমাজের মূলভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় অপরিহার্য। তিনি ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মা-বাবা ও সন্তানকেন্দ্রিক পরিবারব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশসহ বহু দেশ একমত।
সম্মেলনের পূর্বে রাষ্ট্রদূত মিশরের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও একাডেমিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি ও শিক্ষা-সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
সম্মেলনে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন ও সৌদি আরব-এর রাষ্ট্রদূতগণ অংশগ্রহণ করেন, যা এটিকে একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বরা, যার মধ্যে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ আবদুর রহমান আদ-দুওয়াইনি, ড. নাযির আয়্যাদ, ড. সালাম দাউদ, ড. আলী জুমা, ড. শাওকি আল্লাম এবং ড. নাসর ফারিদ ওয়াসিল।
সম্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আতা আবদুল আতি আস-সানবাতি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রভাবের কারণে পরিবার আজ বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সম্মেলনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি পরিবারকে একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আলেম ও দাওয়াহকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।
সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মাশদুর হাতুন। তিনি নববী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবার রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিভিন্ন সেশনে বক্তারা পরিবারকে “সমাজের সুরক্ষিত দুর্গ” হিসেবে উল্লেখ করে নৈতিকতা, শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। ইসলামিক ল’ বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব আল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক এ প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে তিনি গর্বিত এবং অর্জিত জ্ঞান দেশে কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ছয়টি বৈজ্ঞানিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী অধিবেশনে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ সাদিক ১৮ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন। এতে পারিবারিক আইন সংস্কার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, বিয়ের পূর্ব প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় পারিবারিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এ সম্মেলন বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
মন্তব্য করুন