মানুষের হাতে থাকা সম্পদ মূলত আল্লাহর দেওয়া আমানত। জীবদ্দশায় মানুষ সেই সম্পদের মালিকানা ভোগ করলেও মৃত্যুর পর তা কারা পাবেন, সে বিষয়ে ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট বিধান। তবে উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, আবেগ ও সামাজিক প্রচলনের কারণে অনেক পরিবারেই সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধ ও বঞ্চনার ঘটনা ঘটে।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি সন্তান-সন্ততি ও পিতা-মাতা না রেখে মারা গেলে তাঁর সম্পদের উত্তরাধিকারী কারা হবেন—এ প্রশ্নটি ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে ফিকহের পরিভাষায় ‘কালালাহ’ বলা হয়।
মুফতি আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মতে, ‘কালালাহ’ বলতে সাধারণভাবে এমন মৃত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার মৃত্যুর সময় সন্তান-সন্ততি ও পিতা-মাতার মতো ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উত্তরাধিকারী জীবিত নেই, তবে অন্যান্য নিকটাত্মীয় জীবিত রয়েছেন। এ বিষয়ে কুরআনের সূরা আন-নিসার শেষাংশে বিস্তারিত বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু সন্তান না থাকলেই প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে কালালাহ বলা যাবে না। পিতা, দাদা, সন্তান, নাতি-নাতনি এবং অন্যান্য উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন কি না, তার ওপর সম্পদ বণ্টনের কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাস্তব কোনো সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সব জীবিত উত্তরাধিকারীর তালিকা যাচাই করে যোগ্য আলেম বা ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ইসলামী উত্তরাধিকারবিষয়ক জ্ঞানকে ‘ইলমুল ফারায়েজ’ বলা হয়। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা ফারায়েজ শিক্ষা করো এবং তা মানুষকে শিক্ষা দাও।’ ফারায়েজের মূল উদ্দেশ্য হলো শরিয়ত নির্ধারিত অধিকার যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সন্তান না রেখে কোনো নারী মারা গেলে তাঁর স্বামী জীবিত থাকলে, সাধারণভাবে স্বামী অর্ধেক (১/২) সম্পদের অংশীদার হন। আর কোনো পুরুষ সন্তান না রেখে মারা গেলে তাঁর স্ত্রী একজন হোক বা একাধিক—সবাই মিলে এক-চতুর্থাংশ (১/৪) অংশ পাবেন।
তবে এসব অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যান্য জীবিত উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধানও বিবেচনায় নিতে হয়।
মা জীবিত থাকলে তাঁর অংশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোন থাকলে মা সাধারণত এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পান। অন্য কিছু পরিস্থিতিতে তাঁর অংশ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) হতে পারে।
দাদি বা নানির উত্তরাধিকারও পরিস্থিতিনির্ভর। মা জীবিত থাকলে সাধারণত দাদি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
মৃত ব্যক্তির বৈপিত্রেয় ভাই-বোন—অর্থাৎ একই মায়ের সন্তান কিন্তু পিতা ভিন্ন—থাকলে তাঁদের জন্যও শরিয়তে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
একজন বৈপিত্রেয় ভাই বা বোন থাকলে তিনি এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পেতে পারেন। আর একাধিক হলে তারা সম্মিলিতভাবে এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পাওয়ার বিধান রয়েছে। এ নির্দিষ্ট অংশের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান অংশ পান।
একই পিতা-মাতার সন্তান অর্থাৎ সহোদর ভাই-বোন থাকলে উত্তরাধিকার কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়। নির্দিষ্ট শর্তে একজন সহোদর বোন অর্ধেক (১/২) পেতে পারেন। দুই বা ততোধিক সহোদর বোন থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পেতে পারেন।
তবে সহোদর ভাই ও বোন একসঙ্গে থাকলে তারা আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পদের অংশীদার হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান হওয়ার বিধান রয়েছে।
একই পিতার সন্তান কিন্তু মা ভিন্ন—এমন ভাই-বোনকে বৈমাত্রেয় ভাই-বোন বলা হয়। তাঁদের উত্তরাধিকার পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে অন্য নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী, বিশেষ করে সহোদর ভাই-বোনের উপস্থিতির ওপর।
তাই শুধু আত্মীয়তার সম্পর্কের নাম শুনে কারও অংশ নির্ধারণ করা ঠিক নয়। মৃত ব্যক্তির জীবিত সব উত্তরাধিকারীর তালিকা সামনে রেখে ফারায়েজের নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করতে হয়।
কেউ যদি সন্তান, পিতা-মাতা ও ভাই-বোন না রেখে কালালাহ অবস্থায় মারা যান, তখন অবশিষ্ট সম্পদের ক্ষেত্রে নিকটবর্তী পুরুষ আত্মীয়দের আসাবা হিসেবে উত্তরাধিকার পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী সহোদর ভাইয়ের ছেলে, বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলে, আপন চাচা এবং বৈমাত্রেয় চাচার মতো আত্মীয়দের উত্তরাধিকার প্রযোজ্য হতে পারে। নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী জীবিত থাকলে দূরবর্তী কোনো উত্তরাধিকারী বঞ্চিত হতে পারেন—এটি ফারায়েজের গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি।
সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা বা নাতনি থাকলে তাঁর ভাই-বোন কোনো অংশ পাবেন না। কিন্তু ফারায়েজের বিধান অনুযায়ী বিষয়টি এত সরল নয়।
শুধু কন্যা বা নাতনি থাকলে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট সম্পদ ভাই-বোন আসাবা হিসেবে পেতে পারেন। আবার মৃত ব্যক্তির ছেলে বা পুত্রের মাধ্যমে নাতি জীবিত থাকলে ভাই-বোনের উত্তরাধিকারের কাঠামো ভিন্ন হতে পারে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত নীতিমতে, নির্ধারিত অংশীদারদের তাঁদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের কাছে যায়।
মৃত ব্যক্তির সম্পদ সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যায় না। প্রথমে দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয়, বৈধ ঋণ এবং শরিয়তসম্মত ওসিয়ত—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে—সম্পন্ন করতে হয়। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
এ ক্ষেত্রে সামান্য ভুল হিসাবেও কারও প্রাপ্য অধিকার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক প্রভাব বা সামাজিক রীতির পরিবর্তে শরিয়তের বিধান অনুসরণ করা জরুরি।
বিশেষ করে কন্যা, বোন, বিধবা কিংবা অন্য কোনো নারী উত্তরাধিকারীকে সামাজিক চাপ বা পারিবারিক সম্পর্কের অজুহাতে তাঁদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। উত্তরাধিকার শুধু সম্পদের বিষয় নয়; এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক বা অধিকার।
মুফতি আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে আবেগের আগে শরিয়তের বিধান এবং প্রচলিত রীতির আগে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা বিবেচনা করা উচিত। কারণ সামান্য ভুল হিসাবও একজন মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করতে পারে।
মানুষ জীবদ্দশায় সম্পদকে নিজের বলে মনে করলেও মৃত্যুর পর সেই সম্পদ অন্যদের অধিকার হয়ে যায়। তাই ইসলামী ফারায়েজের বিধান শুধু সম্পদ ভাগ করার পদ্ধতি নয়; এর মাধ্যমে ন্যায়, আমানতদারি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ আমাদের অন্যায়ভাবে কারও উত্তরাধিকার নষ্ট করা থেকে হেফাজত করুন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পদ বণ্টনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
সূরা আল-কাহাফ, আয়াত ৪৬; মুস্তাদরাক আল-হাকিম, হাদিস ৮০৫৭; সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৭৩৬; ফাতহুল বারি, খণ্ড ১২; আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯; রদ্দুল মুহতার—ইবনে আবেদিন (রহ.)।
মুফতি আব্দুল্লাহ আল-মামুন
গবেষক শিক্ষক, দারুননাজাত মাদ্রাসা কিতাব বিভাগ, ঢাকা।
মন্তব্য করুন