নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা‘দ।
মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করেন, মানুষের আয়-উপার্জন, জীবন-মৃত্যু, সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যসহ অনেক বিষয় আল্লাহ তাআলার ইলম ও নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত। আর মানুষ তার জন্য নির্ধারিত রিজিক লাভ করে বিভিন্ন উপায়-উপকরণের মাধ্যমে।
তাই আমাদের কর্তব্য হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে রিজিক অর্জনের বৈধ উপায়-উপকরণ অনুসন্ধানে চেষ্টা করা। যেমন—চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, চাকরি কিংবা অন্য কোনো হালাল পেশা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> **﴿هُوَ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ ذَلُولٗا فَٱمۡشُواْ فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُواْ مِن رِّزۡقِهِۦۖ وَإِلَيۡهِ ٱلنُّشُورُ ١٥﴾**
> —সূরা আল-মুলক: ১৫
“তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার কর। আর তাঁর কাছেই পুনরুত্থান।”
আজ আমি হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত রিজিক বৃদ্ধির ১৪টি আমল নিয়ে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
### প্রথম আমল: তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা
আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করা, তাঁর নির্দেশাবলি পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা। পাশাপাশি আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, তাওয়াক্কুল করা এবং রিজিকের সন্ধানে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা।
কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
> **﴿وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمۡرِهِۦۚ قَدۡ جَعَلَ ٱللَّهُ لِكُلِّ شَيۡءٖ قَدۡرٗا ٣﴾**
> —সূরা আত-তালাক: ২-৩
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে, আল্লাহ তার সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তার কল্পনাতীত স্থান থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। আর যে ব্যক্তি তার উদ্দেশ্য হাসিলে একমাত্র আল্লাহর শরণাপন্ন হয়, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
বলাবাহুল্য, তাকওয়ার অন্যতম পরিচয় হলো হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং সন্দেহযুক্ত উপার্জন বর্জন করা।
### দ্বিতীয় আমল: তাওবা ও অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করা
বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তেগফার করলেও রিজিকের প্রশস্ততা আসে। আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্যতম নবী ও রাসুল নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে ইরশাদ করেন—
> **﴿فَقُلۡتُ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ إِنَّهُۥ كَانَ غَفَّارٗا ١٠ يُرۡسِلِ ٱلسَّمَآءَ عَلَيۡكُم مِّدۡرَارٗا ١١ وَيُمۡدِدۡكُم بِأَمۡوَٰلٖ وَبَنِينَ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ جَنَّٰتٖ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ أَنۡهَٰرٗا ١٢﴾**
> —সূরা নূহ: ১০-১২
“আর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন। আর তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন এবং দেবেন নদী-নালা।”
হাদিসে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> **«مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ»**
“যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
—আবু দাউদ: ১৫২০; ইবন মাজাহ: ৩৮১৯; তাবরানি: ৬২৯১।
অন্য হাদিসে এসেছে—
> **«مَنْ أَكْثَرَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ»**
“যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
—বাইহাকি: ৬৩৬; হাকেম, আল-মুস্তাদরাক: ৭৬৭৭।
### তৃতীয় আমল: আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের হক আদায়ের মাধ্যমেও রিজিকের প্রশস্ততা আসে।
আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
> **«مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ»**
“যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।”
—বুখারি: ৫৯৮৫; মুসলিম: ৪৬৩৯।
### চতুর্থ আমল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পড়া
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অধিকহারে দরুদ পাঠের মাধ্যমেও কল্যাণ লাভ করা যায়। তোফায়েল ইবন উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম—
“হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার প্রতি অধিকহারে দরুদ পড়তে চাই। আমার দোয়ার মধ্যে আপনার দরুদের জন্য কতটুকু অংশ রাখব?”
তিনি বললেন, “তুমি যতটুকু চাও।”
আমি বললাম, “এক-চতুর্থাংশ?”
তিনি বললেন, “তুমি যতটুকু চাও। তবে যদি তুমি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম হবে।”
আমি বললাম, “অর্ধেক?”
তিনি বললেন, “তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম হবে।”
এভাবে দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলার পর তিনি যখন বললেন, “আমি আমার পুরো দোয়াটাই আপনার দরুদের জন্য রাখব”, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
**“তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা ও প্রয়োজনের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।”**
—তিরমিজি: ২৬৪৫; হাকেম, আল-মুস্তাদরাক: ৭৬৭৭।
### পঞ্চম আমল: আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা
আল্লাহর রাস্তায় কেউ ব্যয় বা দান করলে তা বিফলে যায় না। বরং আল্লাহ তাআলা এর বিনিময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
> **﴿قُلۡ إِنَّ رَبِّي يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ وَيَقۡدِرُ لَهُۥۚ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ ٣٩﴾**
> —সূরা সাবা: ৩৯
“বল, নিশ্চয় আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিজিকদাতা।”
### ষষ্ঠ আমল: বারবার হজ ও উমরা করা
হজ ও উমরা পাপ মোচনের পাশাপাশি অভাব-অনটন দূর করারও মাধ্যম।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> **«تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ»**
“তোমরা হজ ও উমরা পরপর করতে থাক। কেননা তা অভাব ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে।”
—তিরমিজি: ৮১৫; নাসাঈ: ২৬৩১।
### সপ্তম আমল: দুর্বলদের প্রতি সদয় হওয়া
মুসআব ইবন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে ভাবলেন, হয়তো তাঁর বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের কারণে তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি মর্যাদাবান। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
> **«هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلاَّ بِضُعَفَائِكُمْ»**
“তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক প্রদান করা হয়।”
—বুখারি: ২৮৯৬।
অতএব সমাজের দুর্বল, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
### অষ্টম আমল: ইবাদতের জন্য ঝঞ্ঝাটমুক্ত হওয়া
আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিজেকে সময় দেওয়ার মাধ্যমেও অভাব দূর ও অন্তরে প্রাচুর্য লাভ হতে পারে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> **«إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ…»**
“হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝঞ্ঝাটমুক্ত হও; আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্যে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য দূর করে দেব…”
—তিরমিজি: ২৬৫৪; মুসনাদ আহমদ: ৮৬৮১; ইবন মাজাহ: ৪১০৭।
### নবম আমল: আল্লাহর পথে হিজরত করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজরত তথা স্বদেশ ত্যাগ করলেও এর মাধ্যমে রিজিকের প্রশস্ততা লাভের কথা কুরআনে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> **﴿وَمَن يُهَاجِرۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ يَجِدۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُرَٰغَمٗا كَثِيرٗا وَسَعَةٗۚ وَمَن يَخۡرُجۡ مِنۢ بَيۡتِهِۦ مُهَاجِرًا إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ يُدۡرِكۡهُ ٱلۡمَوۡتُ فَقَدۡ وَقَعَ أَجۡرُهُۥ عَلَى ٱللَّهِۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ١٠٠﴾**
> —সূরা আন-নিসা: ১০০
“আর যে আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে জমিনে বহু আশ্রয়ের জায়গা ও সচ্ছলতা পাবে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে মুহাজির হয়ে নিজ ঘর থেকে বের হয়, তারপর তাকে মৃত্যু পেয়ে বসে, তাহলে তার প্রতিদান আল্লাহর ওপর অবধারিত। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসসহ কয়েকজন সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুমের ব্যাখ্যায় ‘সচ্ছলতা’ বলতে রিজিকের প্রশস্ততার কথাও বলা হয়েছে।
### দশম আমল: আল্লাহর পথে জিহাদ
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জিহাদের ক্ষেত্রেও রিজিকের কথা হাদিসে এসেছে।
ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
> **«وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي»**
“আর আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে।”
—মুসনাদ আহমদ: ৫৬৬৭; বাইহাকি: ১১৫৪।
### একাদশ আমল: আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা
আল্লাহ যে রিজিক ও নেয়ামত দান করেছেন, তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং তাঁর প্রশংসা করা উচিত। কারণ, শুকরিয়ার ফলে নেয়ামত বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা।
তিনি ইরশাদ করেন—
> **﴿وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧﴾**
> —সূরা ইবরাহিম: ৭
“আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার শাস্তি কঠিন।’”
### দ্বাদশ আমল: বিয়ে করা
বর্তমানে অনেকে দুনিয়াবি প্রাচুর্য ও বিলাসিতার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে আর্থিক সামর্থ্য না থাকার অজুহাতে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিয়ে বিলম্বিত করেন। অথচ কুরআনে বিয়ের মাধ্যমে অভাবমুক্তির কথাও বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
> **﴿وَأَنكِحُواْ ٱلۡأَيَٰمَىٰ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰلِحِينَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَإِمَآئِكُمۡۚ إِن يَكُونُواْ فُقَرَآءَ يُغۡنِهِمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ ٣٢﴾**
> —সূরা আন-নূর: ৩২
“আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”
উমর ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর, যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, “তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।”
### ত্রয়োদশ আমল: অভাবের সময় আল্লাহমুখী হওয়া ও তাঁর কাছে দোয়া করা
রিজিক অর্জন ও অভাব দূরীকরণে আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি। কারণ তিনিই রিজিকদাতা এবং তিনি অসীম ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> **﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ﴾**
> —সূরা আল-মুমিন: ৬০
“আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’”
অতএব আল্লাহর কাছে রিজিকের জন্য দোয়া করা উচিত। যেমন—
“হে রিজিকদাতা, আমাকে রিজিক দান করুন। আপনি সর্বোত্তম রিজিকদাতা। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পবিত্র ও প্রশস্ত রিজিক চাই। হে এমন সত্তা, যার দানের ভাণ্ডারে কোনো কমতি নেই। হে আল্লাহ, আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার দয়া দ্বারা আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন, তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন এবং তাতে বরকত দিন।”
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> **«مَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ وَمَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِاللَّهِ فَيُوشِكُ اللَّهُ لَهُ بِرِزْقٍ عَاجِلٍ أَوْ آجِلٍ»**
“যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়, অতঃপর তা মানুষের কাছে সোপর্দ করে, তার অভাব মোচন করা হয় না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়ে এর প্রতিকারে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয়, আল্লাহ অচিরেই তাকে দ্রুত অথবা বিলম্বিত রিজিক দান করবেন।”
—তিরমিজি: ২৮৯৬; মুসনাদ আহমদ: ৪২১৮।
### চতুর্দশ আমল: গুনাহ ত্যাগ, দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও নেক আমল করা
গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল থাকা এবং নেক আমল করার মাধ্যমেও রিজিকের পথ প্রশস্ত হয়—পূর্বে উল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা দুনিয়ায় চিরদিন থাকার জন্য আসিনি। তাই দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> **﴿بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧﴾**
> —সূরা আল-আ‘লা: ১৬-১৭
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখিরাত সর্বোত্তম ও স্থায়ী।”
পরকালের মুক্তি ও চিরশান্তিই যার প্রধান লক্ষ্য, তার উচিত রিজিকের জন্য অতিরিক্ত হাহাকার না করে অল্পে তুষ্ট থাকার চেষ্টা করা।
হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> **«قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ»**
“ওই ব্যক্তি প্রকৃত সফল, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ রিজিক দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তাতে সন্তুষ্ট করেছেন।”
—মুসলিম: ২৪৭৩; তিরমিজি: ২৩৪৮; আহমদ: ৬৫৭২।
পরিশেষ-
পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের রিজিক অর্জনের বৈধ উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার এবং হালাল উপার্জনে উদ্যোগী ও সফল হওয়ার তাওফিক দান করেন। তিনি যেন আমাদের সবার রিজিক ও উপার্জনে প্রশস্ততা এবং বরকত দান করেন।
হে আল্লাহ, আমার এই শ্রমকে আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যম এবং সদকায়ে জারিয়ার উপকরণ হিসেবে কবুল করুন। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর গুণাবলি ও দ্বীনের বিষয়গুলো জানার, বোঝার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন