
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শক্তিপীঠ দেবী যশোরেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন যশোরের প্রখ্যাত রাজা প্রতাপাদিত্যের কাকা শ্রী বসন্ত রায়—এমনটাই জানা যায় ঐতিহাসিক ও লোকজ সূত্রে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র এই শক্তিপীঠটি বর্তমান খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর এলাকায় অবস্থিত।
তন্ত্রশাস্ত্রের ‘পীঠনির্ণয়তন্ত্র’ মতে, এখানে দেবী সতীর “পাণিপদ্ম” পতিত হয়েছিল। ‘পাণি’ অর্থ হাত এবং ‘পদ্ম’ অর্থ কমলফুল—অর্থাৎ দেবীর করকমলে ধারণ করা পদ্মের শক্তিরূপ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে—
“যশোরে পাণিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী, চণ্ডশ্চ ভৈরবো যত্র তত্র সিদ্ধির্ন সংশয়।”
এখানে দেবীর নাম যশোরেশ্বরী এবং ভৈরব হিসেবে পূজিত হন চণ্ড। ভক্তদের বিশ্বাস—দেবী যশ, কীর্তি, আয়ু, আরোগ্য, সম্পদ, সৌন্দর্য প্রভৃতি বর প্রদান করেন। আবার নিষ্কাম ভক্তরা আত্মজ্ঞান, চৈতন্য ও মাতৃকৃপা লাভের আশায় সাধনা করে থাকেন।
লোককথা অনুযায়ী, বারো ভূঁইয়ার শাসনামলে রাজা প্রতাপাদিত্যের এক বিশ্বস্ত অনুচর কমলখোঁজা ইচ্ছামতী নদীর তীরে এক অলৌকিক জ্যোতি দেখতে পান। বিষয়টি রাজাকে জানালে তিনি বনজঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে দেবী সতীর অঙ্গশিলা উদ্ধার করেন। অন্য একটি মতে, ‘যশ পাটনী’ নামের এক মাঝি নদীতে জ্যোতি দেখে খবর দিলে ডুবুরি নামিয়ে অঙ্গশিলা তোলা হয়।
এই ঘটনার পর রাজা প্রতাপাদিত্যের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে তিনি উৎকল আক্রমণ করে বিভিন্ন দেবমূর্তি এনে নিজ রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
মুঘল শাসনামলে সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ প্রতাপাদিত্যের রাজ্যে আক্রমণ চালান। তখন দেবী সতীর অঙ্গশিলা জয়পুরে নিয়ে যাওয়া হয়—এমন বিশ্বাসও প্রচলিত আছে। তবে স্থানীয় পুরোহিতদের কেউ কেউ দাবি করেন, আসল অঙ্গশিলা গোপন রাখা হয়েছিল এবং জয়পুরে নেওয়া হয়েছিল প্রতিরূপ।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, দেবী যশোরেশ্বরীর বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন রাজা প্রতাপাদিত্যের কাকা শ্রী বসন্ত রায়। প্রাচীনকালে মন্দিরটি নান্দনিক কারুকার্যে সমৃদ্ধ ছিল। সময়ের ব্যবধানে অনেক অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং সংস্কারের ফলে মূল স্থাপত্যের বহু অংশ সিমেন্টের আবরণে ঢাকা পড়েছে।
মন্দির সংলগ্ন এলাকায় রাজপরিবার নির্মিত যাত্রীনিবাস ও পূজারি আবাস ছিল, যা বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত। বংশপরম্পরায় এক অধিকারী ব্রাহ্মণ পরিবার এখানে পূজার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তন্ত্রমতে এখানে দেবী কালী রূপে পূজিত হন। অতীতে নরবলির প্রচলন ছিল বলে জনশ্রুতি থাকলেও বর্তমানে ছাগবলিসহ প্রতীকী বলি প্রথা চালু রয়েছে। দুর্গাপূজা, কালীপূজা ও বিভিন্ন তিথিতে এখানে ব্যাপক সমারোহে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
যশোর থেকে দক্ষিণে সাতক্ষীরা জেলায় পৌঁছে কালীগঞ্জ হয়ে শ্যামনগর যেতে হয়। সেখান থেকে বংশীপুর বাজারের অদূরেই ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শক্তিপীঠ। ঢাকা থেকেও সড়কপথে সহজে যাওয়া যায়।
হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে দেবী যশোরেশ্বরী সর্বসিদ্ধিদায়িনী মহাশক্তি। ভক্তদের কাছে তিনি যশ, শক্তি ও মুক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে।
মন্তব্য করুন