
মিসরে আবাসিক অনুমতি (ইকামা) বিহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযান ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এই অভিযানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থীও আটক হচ্ছেন, যাদের একটি বড় অংশ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আল-আজহার কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে এবং ইকামা বিহীন শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে চলাচল না করার আহ্বান জানিয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অভিযানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে মিসরীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি জটিল বাস্তবতা।
মিসরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপে অবৈধভাবে মানবপাচারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্র বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এনে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায় এবং নৌপথে ইজিপ্ট হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিবাসনপ্রত্যাশী ব্যক্তি মিসরের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হন। ফলে প্রশাসনের নজরদারিতে নির্দিষ্ট কিছু জাতিগোষ্ঠী বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে পড়ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তি নিজেদের ‘ছাত্র’ পরিচয় ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ভুয়া ছাত্র পরিচয়ে বা শিক্ষার্থীদের নাম ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার ঘটনাও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ও গ্রুপ খুলে ইউরোপগামী হওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, যা তরুণদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এসব তৎপরতা শুধু অভিবাসন আইন লঙ্ঘন নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে মিসরীয় প্রশাসন ইকামাহীনদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে এর প্রভাব পড়ছে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের ওপরও। অনেক শিক্ষার্থী কাগজপত্র নবায়নের জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব বা আর্থিক সংকটের কারণে সময়মতো ইকামা হালনাগাদ করতে পারেননি—ফলে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রবাসী কমিউনিটির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ইকামা দ্রুত হালনাগাদ করা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঙ্গে রাখা এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা অনলাইন প্রলোভন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির দায়িত্বশীল মহল মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন তৎপরতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি প্রবাসী সমাজের জন্য নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধেরও একটি কঠিন পরীক্ষা। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মিসরে আগত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
মন্তব্য করুন