
রমজানের সেহরির সময় মানুষকে জাগিয়ে তোলার প্রাচীন ঐতিহ্য ‘মেসহারাতি’ আজও টিকে আছে মিশরের রাজধানী কায়রো-এর পুরনো অলিগলিতে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও শতাব্দীপ্রাচীন এই সংস্কৃতি রমজানের আধ্যাত্মিক আবহকে জীবন্ত রাখছে।
রমজানের রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ঢাকের মৃদু শব্দ ভেসে আসে, তখন পুরনো কায়রোর ফাতেমি যুগের স্থাপত্যঘেরা সরু পথঘাট যেন ইতিহাসের কথা বলে ওঠে। হাতে ছোট ঢাক, পরনে ঐতিহ্যবাহী গালাবিয়া—এভাবেই মেসহারাতিরা সেহরির আগে পাড়া-মহল্লা ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় পরিচিত আহ্বান—“ইয়া নায়েম, ওয়াহহিদুদ দায়েম”—যা রমজানের আধ্যাত্মিক আবহকে গভীর করে তোলে।
ইতিহাসবিদদের মতে, সেহরির জন্য মানুষকে জাগানোর প্রথা ইসলামের প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত। বর্ণনায় উল্লেখ আছে, সাহাবি আনবাসা ইবনুল আব্বাস (রা.)-কে প্রথম দিককার মুসাহহারাতি হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে মিশরে এই প্রথা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ফাতেমি আমলে। খলিফা হাকেম বি আমরিল্লাহ (১০০৪ খ্রি.) সৈন্যদের নির্দেশ দেন রাতের বেলায় ঘরে ঘরে কড়া নেড়ে মানুষকে জাগাতে। সেখান থেকেই সংগঠিতভাবে মেসহারাতির যাত্রা শুরু।
মামলুক যুগে এসে এ ঐতিহ্য আরও নান্দনিকতা লাভ করে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ইবন নুকতাহ নামে এক ব্যক্তি সুলতান আল-নাসের মুহাম্মদ-এর ব্যক্তিগত মুসাহহির ছিলেন। এ সময় ঢাক-তবলার তাল, সুরেলা নাশিদ ও ছন্দময় হাঁক প্রথাটিকে সাংস্কৃতিক মর্যাদা দেয়।
অটোমান আমলে মেসহারাতি কায়রোর সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। তারা শুধু মানুষকে জাগাতেন না; অনেক সময় বাসিন্দাদের নাম ধরে ডাকতেন, তাদের জন্য দোয়া করতেন এবং পাড়াভিত্তিক এক সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতেন।
বর্তমানে মাইক্রোফোন, লাউডস্পিকার ও মোবাইল অ্যাপ সেহরির ঘোষণা দিলেও পুরনো কায়রোর অনেক এলাকায় এখনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বহাল রয়েছে। মেসহারাতির পোশাক-পরিচ্ছদও এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ঢিলেঢালা গালাবিয়া, মাথায় টাকিয়া বা পাগড়ি এবং হাতে ছোট ড্রাম তাকে আলাদা পরিচয় দেয়।
এ কাজ মূলত সেবামূলক। পাড়া-প্রতিবেশীরা রমজান শেষে খেজুর, খাবার বা সামান্য অর্থ দিয়ে সম্মান জানায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পেশার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগেও মেসহারাতির আবেদন অমলিন থাকার কারণ হলো এর মানবিক স্পর্শ। এটি শুধু জাগানোর মাধ্যম নয়; বরং রমজানের স্মৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও সম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতীক। শতাব্দী পেরিয়ে আজও কায়রোর রমজান রাত মেসহারাতির ঢাকের তালে ইতিহাস ও বর্তমানকে এক সুতোয় গেঁথে রাখছে।
মন্তব্য করুন