মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় মনু নদ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর আপত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। ফলে প্রতিবছরের মতো চলতি বর্ষা মৌসুমেও বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক বাসিন্দা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মনু নদীর ভাঙন ও বন্যা থেকে কুলাউড়া, রাজনগর এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা রক্ষায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মনু নদ প্রতিরক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পাঁচ বছর ধরে চলমান এ প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা চারটি স্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ কাজ বিএসএফের আপত্তির কারণে বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের অধিকাংশ অংশের কাজ শেষ হলেও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো অরক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে সামান্য পাহাড়ি ঢল নামলেই নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা মনু নদ সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে এসব স্থানে কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিষয়টি ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে উত্থাপন করা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান মেলেনি।
এরই মধ্যে চলতি বর্ষায় প্রকল্পের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। গত ৮ জুলাই গভীর রাতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে শিকড়িয়া, আলীনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ভাঙা বাঁধের ওপর স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে চলাচল করছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য তাহির আলী বলেন, প্রতিবছরই নদীভাঙন ও বন্যার কারণে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকার বাসিন্দা ময়জুল মিয়া ও ইউনুস মিয়া জানান, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় পৃথিমপাশা, টিলাগাঁও, হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের হাজারো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাজাপুর, বেলরতল ও ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ ঠিকাদারদের ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে বারবার পিছিয়েছে। অন্যদিকে শিকড়িয়া, নিশিন্তপুর, তেলিবিল ও দত্তগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এখনও সংস্কার না হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম বিষয়টি তুলে ধরে সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, “প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানে বিএসএফের আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনায় আছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে জরুরি মেরামত ও সুরক্ষামূলক কাজ অব্যাহত রয়েছে।”
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার জানান, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য জেলা উন্নয়ন সভায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ বলেছেন, সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া ও দত্তগ্রাম এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার ও মাটি ভরাটের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে।
স্থানীয়দের আশা, দুই দেশের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান হলে দীর্ঘদিনের ঝুঁকি দূর হবে এবং মনু নদ তীরবর্তী লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ বন্যা ও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
মন্তব্য করুন