জীবনের প্রতিটি অধ্যায় নতুন করে লেখা যায়—যদি ইচ্ছাশক্তি অটুট থাকে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা দৃঢ় হয়। সেই সত্যের এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ মিশরের আমাল ইসমাইল।
মিশরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম তাঁর। শৈশবেই পারিবারিক দায়িত্ব ও জীবনের বাস্তবতা তাঁকে নিয়মিত শিক্ষাজীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সময়ের সঙ্গে সংসার, পরিবার ও সন্তানের দায়িত্বই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান অধ্যায়। চার সন্তানের জননী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সঙ্গে পরিবার গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেন।
তবে জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা কখনো নিভে যায়নি।
৩৮ বছর বয়সে তিনি আবার বই হাতে তুলে নেন। বহু বছরের বিরতির পর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু পারিবারিক দায়িত্বের কারণে আবারও পড়াশোনায় বিরতি দিতে হয়। তবুও তিনি আশা ছাড়েননি।
এরপর জীবনে আসে আরও কঠিন পরীক্ষা। তিনি দু’বার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থ হয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। প্রতিটি প্রতিকূলতা যেন তাঁর ধৈর্য, ঈমান ও দৃঢ়তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সময়ের প্রবাহে তাঁর বয়স যখন সত্তরের কোঠায়, তখন অনেকেই জীবনের শেষ অধ্যায়ে বিশ্রামকে বেছে নেন। কিন্তু তাঁর মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের অনুপ্রেরণায় তিনি আবারও পড়াশোনায় ফিরে আসেন।
উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি মিশরের মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস অনুষদের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে গবেষণার দীর্ঘ পথচলা শুরু করেন।
অবশেষে ৮৪ বছর বয়সে, যে সময়ে অনেকের হাতে কলম ধরাও কঠিন হয়ে পড়ে, সেই বয়সেই তিনি গবেষণা সম্পন্ন করে প্রথম শ্রেণির সম্মানসহ ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
আমাল ইসমাইলের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আল্লাহ যদি কোনো বান্দার অন্তরে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি করেন, তবে সময়, বয়স কিংবা প্রতিকূলতা সেই আলোকে নিভিয়ে দিতে পারে না। তিনি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি বাধা অতিক্রম করেছেন।
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব সমানভাবে তুলে ধরেছে। মহানবী ﷺ বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।” (সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: ২২৪)
ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য নারী ইলম, হাদিস, ফিকহ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমাল ইসমাইলের জীবনও সেই চিরন্তন শিক্ষার এক আধুনিক প্রতিফলন।
এই জীবনকাহিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু সুন্দর স্বপ্নের বয়স বাড়ে না। আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং পরিবারের সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুনভাবে পথচলা শুরু করা সম্ভব। জ্ঞান অন্বেষণের পথ কখনো শেষ হয় না; বরং তা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনের কল্যাণের দিশা দেখায়।
লেখক:
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।
মন্তব্য করুন