আলী আজীম, মোংলা প্রতিনিধি
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:০৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মোংলায় জমে উঠছে বিএনপি-জামায়াতের লড়াই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের বাকি মাত্র কয়েকদিন। এরই মধ্যে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা প্রতিশ্রুতিতে সরগরম হয়ে উঠেছে বাগেরহাট-৩ সংসদীয় এলাকার নির্বাচনি পরিবেশ।

আসনটিতে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের লড়াই হবে মূলত বিএনপির প্রার্থী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের মধ্যে।

আসনটিতে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু একবার ১৯৯৬ সালে জয়ী হয়েছিল বিএনপি। এছাড়া দীর্ঘ সময় এই আসনে আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের।

ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণার গতি এবং ততই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটের লড়াই। তবে এখন পর্যন্ত আসনটির কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আধুনিক হাসপাতাল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা।

এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দলগুলোর মধ্যে নয়, বরং ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ও স্থানীয় সমর্থকের ওপরও নির্ভর করছে। আওয়ামীলীগ মাঠে না থাকায় এখন তাদের সমর্থকদের দিকে চেয়ে আছে দুই প্রার্থী।

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক। তবে এবার ভিন্নতা এসেছে ফেস্টুন ও ব্যানার সাঁটানোতে। নির্বাচনি এলাকার সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁশ ও রশির সাহায্যে টানানো হয়েছে সাদা-কালো ফেস্টুন ও ব্যানার। চায়ের দোকান, হাট-বাজার, অফিস-আদালতসহ সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, কে হচ্ছেন এই আসনের আগামীর অভিভাবক।

অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। তবে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কাজ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে উপজেলার ১৬ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে বাগেরহাট-৩ আসন গঠিত। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর এই আসনে অবস্থিত। এ আসনে এবার ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বিএনপির প্রার্থী হলেন, বাগেরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বাগেরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অধ্যক্ষ শেখ জিল্লুর রহমান, সতন্ত্র প্রার্থী বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক এমপি বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম ও জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল (জাসদ)’র মো. হাবিবুর রহমান মাস্টার।

আরো পড়ুন...  টেকনাফে নামাজরত শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যা: পুত্রবধূ আটক

এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৪ জন। পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩২ হাজার ৩৫০ জন। মহিলা ভোটার এক লাখ ৩৪ হাজার ৫০৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ৪ জন।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের পর বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপি-জামায়াত ও শরিকদের পুনরায় উত্থানকে রাজনৈতিক ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জনগণের আকাঙ্খা, দীর্ঘ দমন-পীড়নের ইতিহাস এবং বিরোধী দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আসনটি এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘নির্বাচনী হটস্পটে’।

স্থানীয় ভোটাররা জানান, আসনের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে আ.লীগ ও সনাতনধর্মের সমর্থক ভোটারের দিকে।

তারা বলেন, যে প্রার্থী আগামী দিনে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল বাণিজ্য এবং হামলা-মামলা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারবে, তার প্রতি আমাদের ভোট যাবে। এ ছাড়া স্থানীয় নেতাদের অতীত কর্মকান্ডও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

ভোটারদের ভাষ্য, মোংলার প্রধান সমস্যা পানি। সেই সঙ্গে নেই চিকিৎসার জন্য ভালো হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ। নেই তেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। নির্বাচন এলে প্রার্থীরা এগুলো করার কথা বলেন, কিন্তু নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না, শুধু নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়। তাই এবার যিনি পানি, শিক্ষা-চিকিৎসার উন্নয়ন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি রোধ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন, তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হবে।

নতুন ভোটাররা জানান, তারা ভোট দেবেন বলে আনন্দিত। তারা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে চান। তবে যারাই ক্ষমতায় আসুক না, যেন তরুণদের সুখ-দুঃখে পাশে থেকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন সেই প্রত্যাশা তাদের।

গণঅভ্যুত্থানের পর আ. লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতা পলাতক অথবা কারাগারে। সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও একই অবস্থায় আছেন। এই পরিস্থিতি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বীতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।

বাগেরহাট-৩ সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন বাদে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রত্যকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৭৬ হাজার ৭ শত ৭৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর গাজী আবু বক্কর সিদ্দিকি। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৬৯ হাজার ৩ শত ১০ ভোট।

আরো পড়ুন...  চারঘাটে ভেজাল খাদ্য উৎপাদনে কঠোর অভিযান

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাবিবুন নাহার বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৯৭ হাজার ১৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল ওয়াদুদ শেখ। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পান ৬৬ হাজার ১ শত ৭৭ ভোট।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের হাবিবুন নাহার, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির আব্দুল ওয়াদুদ শেখ, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির সেকেন্দার আলী মনি, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির রেজাউল শেখ, হাত পাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শাহ জালাল সিরাজী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাবিবুন নাহার বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭ শত ৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির আব্দুল ওয়াদুদ শেখ। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান মাত্র ২ হাজার ৪ শত ৭১ ভোট।
কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বেগম হাবিবুন নাহার বিজয়ী হন। নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি এবং তাদের সমমনা দলগুলো এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাগেরহাট-৩ আসনে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে টানা আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। বিএনপি বিজয়ী হয় শুধুমাত্র ষষ্ঠ সংসদে।

ভোটাররা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হবেন তা নির্ভর করবে নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আ.লীগ সমর্থক ও সনাতনধর্মের ভোটের ওপর।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোরেলগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে জামায়াতের স্বারকলিপি প্রদান

মোরেলগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন অভিযান শুরু

মোরেলগঞ্জে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন

রাজারহাটে পিকআপ-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ঝরে গেল বাবা-ছেলের প্রাণ

ডেঙ্গু ঠেকাতে তেতুলিয়ায় প্রশাসন-স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ উদ্যোগ

জগন্নাথপুরে সীমানা প্রাচীর ভাঙচুরের অভিযোগ, ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি; থানায় অভিযোগ

বিশেষ অভিযানে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ ১৭ জনকে ধরল মৌলভীবাজার পুলিশ

সুন্দরগঞ্জে রামজীবন ইউনিয়ন কৃষক দলের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মোংলায় উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে নির্বাচন

সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে বিএনপি: গাজীপুর-১ আসনের এমপি মজিবুর রহমান

১০

সুন্দরগঞ্জ মডেল প্রেসক্লাবের সভায় সাংগঠনিক উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের সিদ্ধান্ত

১১

ভোলাহাট সীমান্তে বিজিবির অভিযান, মাদক পাচারচক্রের ৩ সদস্য আটক

১২

যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে শাহাজাহান রনি, উচ্ছ্বাসে শ্যামনগর

১৩

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে নরসুন্দা নদী রক্ষার দাবিতে কিশোরগঞ্জে মানববন্ধন

১৪

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে মাগুরায় বৃক্ষরোপণ ও মানববন্ধন কর্মসূচি

১৫

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেঁপে উঠল ভূরুঙ্গামারী বাজার, পুড়ে ছাই শতাধিক দোকান

১৬

ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় পৈতৃক জমি বিরোধে ন্যায়বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

১৭

হাকালুকি হাওরে অভিযান: ৫৫০ কেজি পোনা জব্দ, জরিমানা আদায়

১৮

ঝটিকা মিছিলের অভিযোগে কিশোরগঞ্জে ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

১৯

স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেই ফেসবুক লাইভে আত্মহত্যা, মোরেলগঞ্জে যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু

২০