
ভোটের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। এই সময়ের মধ্যে উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা ও কৌতূহল দুটোই বাড়ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, মিছিল এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনার কর্মসূচি। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকায় এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণার দৃশ্যমান তৎপরতা থাকলেও ভোটের ভেতরের সমীকরণে জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম এখনো তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। শ্যামনগর দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতে ইসলামীর একটি ঐতিহাসিক শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটির উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি এখনো স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে উঠে আসে।
এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ গাজী নজরুল ইসলাম। উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগপ্রবণ বাস্তবতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তাঁর প্রতি একটি স্থায়ী আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, জনপদ রক্ষা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে মাঠপর্যায়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ভোটারদের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, রাজনৈতিক জীবনে নানা মামলার মুখোমুখি হলেও গাজী নজরুল ইসলাম কখনো এলাকা ছেড়ে যাননি। রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এলাকায় থেকে জনসংযোগ অব্যাহত রাখায় ভোটারদের কাছে তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও সাহস একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামানকে ঘিরে শহরাঞ্চল ও তরুণদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করায় শ্যামনগরের মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে নতুন। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে নীরব অসন্তোষ রয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে, যা ভোটের দিনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিএনপি প্রার্থী সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়ন ও শ্যামনগরকে অর্থনৈতিক জোনে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে, শুধু উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি নয়—দুর্যোগপ্রবণ এই জনপদে প্রয়োজন দীর্ঘ মাঠ অভিজ্ঞতা ও জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।
নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত শ্যামনগর গড়ার অঙ্গীকার করছেন। দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও উপকূলীয় দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে। নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন জামায়াতের প্রচারণায় নতুন গতি এনেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এবার সংখ্যালঘু ভোটারদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৭৬ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের আস্থা অর্জনে উভয় পক্ষই সক্রিয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটব্যাংকের বড় অংশ যেদিকে যাবে, ফলাফলও সেদিকেই ঝুঁকবে।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠলেও অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক ভোটব্যাংক ও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তির কারণে জামায়াত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলামকে এখনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন অনেকে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা ভোটের চূড়ান্ত হিসাব বদলাতে পারে—এমন প্রত্যাশায় দিন গুনছে শ্যামনগরের ভোটাররা।
মন্তব্য করুন