
পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশক মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ দশকে লুকিয়ে আছে লাইলাতুল কদর নামক মহিমান্বিত রজনী, যা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এ সময়ে ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া ও এতেকাফের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অশেষ রহমত ও মাগফিরাত লাভ করতে পারে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেন: ‘নিশ্চয় আমি এটি (কুরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তোমাকে কিসে জানাবে লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’* (সূরা কদর : ১-৩)
লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য
লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, যাতে ইবাদত করলে ৮৩ বছরের ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এ রাতে ফেরেশতারা রহমত ও বরকত নিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন। হাদিসে এসেছে: ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারী ও মুসলিম)।
এতেকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত
এতেকাফ অর্থ বিশেষ নিয়তে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন: ‘রমজানের শেষ দশক আসলে রাসূল (সা.) পরনের লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন, রাত জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে দিতেন।’* (বুখারী ও মুসলিম)
এতেকাফের উপকারিতা:
✅ এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় ফেরেশতাদের দোয়া লাভ
✅ লাইলাতুল কদর তালাশের সুযোগ
✅ আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হওয়া
✅ বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ
✅ তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে ওঠা
✅ অন্তরে প্রশান্তি ও দিল নরম হওয়া
✅ গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়
এতেকাফের বিধানাবলি
এতেকাফের শর্ত:
– মুসলিম ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া
– পবিত্র অবস্থায় থাকা
– মসজিদে অবস্থান করা (পুরুষদের জন্য)
– মহিলাদের জন্য ঘরের নির্ধারিত স্থানে এতেকাফ করা
এতেকাফে যা বৈধ:
✅ প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া (ওজু-গোসল, খাবার আনা)
✅ পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলা
✅ ইলম চর্চা ও কুরআন শিক্ষা দেওয়া
✅ সালামের উত্তর দেওয়া
এতেকাফে যা নিষিদ্ধ:
❌ বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া
❌ স্ত্রীর সাথে মেলামেশা
❌ ক্রয়-বিক্রয় করা
❌ অহেতুক কথা বলা ও সময় নষ্ট করা
লাইলাতুল কদরের বিশেষ দোয়া
হযরত আয়েশা (রা.) নবী করীম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই, তাহলে কী দোয়া করব?’ রাসূল (সা.) বললেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।) – (তিরমিযী)
শেষ দশকের করণীয় আমল
-বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া
-কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা
-ইস্তিগফার ও তওবা করা
-দোয়া ও মোনাজাতে সময় কাটানো
-পরিবারকে ইবাদতে উৎসাহিত করা
-দান-সদকা বৃদ্ধি করা
প্রিয় পাঠক! রমজানের শেষ দশক আমাদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাতের সুযোগ নিয়ে আসে। আসুন আমরা এ সুযোগকে কাজে লাগাই, এতেকাফের মাধ্যমে সময় কাটাই এবং লাইলাতুল কদরের ফজিলত লাভের চেষ্টা করি। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন।
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট, হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী মাজার জামে মসজিদ, সিলেট।
মন্তব্য করুন