
একসময় স্বচ্ছ পানির প্রবাহে সমৃদ্ধ ছিল রাজশাহীর পদ্মা নদী। কিন্তু বর্তমানে নগরীর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে সেই নদীর পানি অনেকটাই দূষিত হয়ে পড়েছে। রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার গৃহস্থালি বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য এবং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পদ্মাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি নদী ও বিল মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর বর্জ্য শুধু পদ্মা নদীতেই নয়, স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা, বারনই ও হোজা নদীতেও গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া এসব নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অন্তত ছয়টি বিলও দূষণের কবলে পড়েছে। নগরীর অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে হাসপাতাল ও বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দূষিত পানির প্রভাবে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে দূষিত পানি কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ায় খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মা ছাড়া রাজশাহীর অন্য পাঁচটি নদী ধীরে ধীরে বর্জ্যবাহী নালায় পরিণত হয়েছে। এসব নদী নগরী ও আশপাশের এলাকায় প্রবাহিত হওয়ায় নগরীর প্রায় সব ধরনের বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নদীগুলোতেই এসে জমা হচ্ছে।
জানা যায়, বারাহী নদী পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে বায়া বাজার এলাকায় বারনই নদীতে গিয়ে মিশেছে। একইভাবে স্বরমঙ্গলা ও নবগঙ্গা নদীর সব বর্জ্যও শেষ পর্যন্ত পবা উপজেলার বায়া এলাকায় বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীর মোহনায় গিয়ে দেখা যায়, কুচকুচে কালো পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও রাসায়নিক বর্জ্যের ফেনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দূষণ ধীরে ধীরে নাটোর জেলার চলনবিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
পদ্মা নদী থেকে নিউমার্কেট এলাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত বারাহী নদী এক সময় ছিল প্রাণবন্ত জলপথ। এই নদীতে এক সময় পালতোলা নৌকা চলত এবং জেলেরা মাছ ধরতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই নদী কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকার বর্জ্য পানি এবং মেডিকেল বর্জ্য সরু খালের মতো প্রবাহিত হয়ে বারাহী নদীতে পড়ে এবং সেখান থেকে বারনই নদীতে গিয়ে মিশছে।
স্থানীয়রা জানান, এলজিইডি ২০২৩ সালে নদীটির নাম পাকুরিয়া খাল হিসেবে উল্লেখ করে বায়া আফি নেপালপাড়া এলাকায় ২৪ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করে। তবে সেতুর নিচে এখন শহরের কালো বর্জ্য পানি প্রবাহিত হয়ে বারনই নদীতে মিশছে। নদীর পানিতে রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে সাদা ফেনা তৈরি হচ্ছে এবং চারদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, এক সময় তিনি এক পয়সা ভাড়া দিয়ে বারাহী নদী পার হয়ে স্কুলে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই নদী শহরের বর্জ্য বহনের ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নদীগুলো রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন