
আরবি চান্দ্র বছরের একাদশ মাস জিলক্বদ (জুলকাআদাহ) মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি মাস। এটি হজের তিন মাস—শাওয়াল, জিলক্বদ ও জিলহজ—এর দ্বিতীয় মাস এবং ইসলামের চারটি হারাম মাসের (মহররম, রজব, জিলক্বদ ও জিলহজ) অন্যতম। এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত থাকার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে, যা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এর মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকীর মতে, জিলক্বদ মাস মূলত ইবাদতের ধারাবাহিকতার মধ্যে একটি প্রস্তুতিমূলক বিশ্রামের সময়। ‘জুলকাআদাহ’ শব্দের অর্থ বসা বা স্থির হওয়া—অর্থাৎ ব্যস্ততার মাঝে সাময়িক বিরতি। রজব, শাবান, রমজান ও শাওয়াল—এই চার মাস মুসলমানদের জন্য ইবাদতে পরিপূর্ণ সময়। আবার জিলহজ ও মহররম মাসও গুরুত্বপূর্ণ আমলের মাস। সেই ধারাবাহিকতায় মাঝখানের জিলক্বদ মাস মুমিনদের জন্য কিছুটা প্রশান্তি নেওয়ার পাশাপাশি আগামীর ইবাদতের প্রস্তুতির সুযোগ এনে দেয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, এই মাসে আরব সমাজ যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে কিছুটা অবসর গ্রহণ করত। ফলে মাসটি একধরনের আত্মশুদ্ধি ও পুনর্গঠনের সময় হিসেবে বিবেচিত হতো। যদিও এই মাসে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আমল নেই, তবুও নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।
কোরআন ও হাদিসে সময়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখনই অবসর পাও, তখনই তোমার রবের ইবাদতে আত্মনিয়োগ কর” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত ৭-৮)। আবার সুরা আসরে সময়ের শপথ করে বলা হয়েছে, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে তারা নয় যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সত্য ও ধৈর্যের পথে আহ্বান জানায়। হাদিস শরিফেও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জিলক্বদ মাসে নফল ইবাদতের মধ্যে রয়েছে—নিয়মিত নফল রোজা রাখা, বিশেষ করে মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বীজের রোজা, প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা পালন, বেশি বেশি নফল নামাজ আদায়, তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত ও আউওয়াবিনের নামাজ আদায়। পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা বৃদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া আসন্ন জিলহজ মাসের হজ ও কোরবানির প্রস্তুতি গ্রহণের জন্যও এই মাস একটি উপযুক্ত সময়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আত্মসমালোচনা, ইবাদতের ঘাটতি পূরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য আত্মপ্রস্তুতির মাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিলক্বদ মাসকে অবহেলা না করে বরং এটিকে আত্মউন্নয়ন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মূল্যবান সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। যথাযথ আমলের মাধ্যমে এই মাসকে কাজে লাগাতে পারলে একজন মুমিন তার আধ্যাত্মিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য করুন