
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায় বিধিনিষেধ থাকলেও জয়পুরহাট-১ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিললেও, নারী ভোট ও তরুণদের সমর্থন নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা। ফলে আসনটি এখন কার্যত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জয়পুরহাট-১ আসন আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ওই সময় সংসদ সদস্য ছিলেন সামছুল আলম দুদু। সরকার পতনের পর রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে এবার নতুন করে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে এসেছে আসনটি। দীর্ঘদিন পর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা থাকায় ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ, মতবিনিময় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফজলুর রহমান সাঈদও পিছিয়ে নেই। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় পরিচিত মুখ তিনি। নারী ভোটারদের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংককে সংগঠিত করতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও নৈতিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
এই দুই শক্তিশালী প্রার্থীর মাঝেই চমক দেখাচ্ছেন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা। মনোনয়নপত্রে ত্রুটির কারণে শুরুতে তার প্রার্থিতা বাতিল হলেও আপিলের মাধ্যমে তা পুনর্বহাল হয়। এরপর থেকেই নারী ভোটার ও তরুণ সমাজের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক কাজ, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তার কারণে তিনি ভোটারদের কাছে আলাদা অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
এ আসনে আরও প্রার্থী রয়েছেন—বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে তৌফিকা দেওয়ান, বাসদ থেকে ওয়াজেদ পারভেজ, এবি পার্টির সুলতান মো. শামছুজ্জামান এবং খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন। সব মিলিয়ে জয়পুরহাট-১ আসনে বর্তমানে মোট বৈধ প্রার্থী সংখ্যা সাতজন।
বিএনপির প্রার্থী মাসুদ রানা প্রধান বলেন, “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে এই আসনে বরাবরই বিএনপি জয়ী হয়েছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলাম। নির্বাচিত হলে জয়পুরহাটে মেডিকেল কলেজ, আধুনিক স্টেডিয়াম ও পার্ক স্থাপন করব।”
জামায়াত প্রার্থী ফজলুর রহমান সাঈদ বলেন, “আমি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত জয়পুরহাট গড়তে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নই হবে আমার অগ্রাধিকার।”
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা বলেন, “আমি নিজের অর্থ ব্যয় করে মানুষের জন্য কাজ করেছি। নারী ও তরুণ ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি জনগণ আমাকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করবে।”
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আল মামুন মিয়া জানান, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি চলছে। প্রতিটি উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সাধারণ ভোটারদের ভাষ্য—দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে এবার তারা সৎ, যোগ্য ও উন্নয়নমুখী প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। জয়পুরহাট-১ আসনের এই ত্রিমুখী লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
মন্তব্য করুন