টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার চার উপজেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জেলার মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় আমনের বীজতলা, আউশ ধানের ক্ষেত, শীতকালীন সবজি ও মৎস্য খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার এবং গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১১ জুলাই) বিকেল ৪টায় মনু নদীর চাঁদনীঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া মনু নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২২৩ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ২৭৫ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হয়। তবে কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার এবং জুড়ি নদীতে ২৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একইভাবে ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে আরও প্রায় ২৫টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার পৌরসভা এলাকা এবং চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর ও শিকড়া এলাকার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিকড়া, আলিনগর, ধামুলিসহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যদিও এসব এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে।
এছাড়া জেলার বৃহৎ জলাভূমি হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের পানিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ১ হাজার ৭৫০ ব্যাগ শুকনো খাবার ও খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বড়লেখায় ২৬০ ব্যাগ, জুড়িতে ১৫৭ ব্যাগ, কুলাউড়ায় ৩৪০ ব্যাগ, রাজনগরে ২১০ ব্যাগ, মৌলভীবাজার সদরে ৩১৩ ব্যাগ, শ্রীমঙ্গলে ২৩৫ ব্যাগ এবং কমলগঞ্জে ২৩৫ ব্যাগ বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, পানিবন্দি মানুষের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্গত মানুষদের সেখানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার বলেন, “টেংরা, কামারচাকসহ কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।”
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
যদিও উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় মনু ও ধলাই নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তবে জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে থাকায় দুর্ভোগ কাটেনি বন্যাকবলিত মানুষের।
মন্তব্য করুন