উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় মৌলভীবাজার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৯০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও বন্যার সময় ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।
গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও একামধু এলাকায় এবং কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকরিয়া এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের তিনটি স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এসব ভাঙন দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
বন্যায় রাজনগরের টেংরা, মনসুরনগর ও সদর ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তলিয়ে যায় অসংখ্য বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য উঁচু স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে বাধ্য হয়।
প্লাবিত গ্রামের মধ্যে রয়েছে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুর, কাঁচারী, একামধু, কান্দিরকুল, পণ্ডিতনগর, আকুয়া, সৈয়দনগর, টগরপুর, কোনাগাঁও, ভাঙ্গারহাট, আদিনাবাদ, পাইকপাড়া, নওয়াগাঁও ও গণেশপুর; মনসুরনগর ইউনিয়নের শ্বাসমহল, বকসীকোনা, মালিকোনা, প্রেমনগর ও গোবিন্দশ্রী এবং রাজনগর সদর ইউনিয়নের গয়ঘর, ডলা, মহাসগস্র ও দত্তগ্রাম। এছাড়া কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকরিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের আশরাফ আলী (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির শেষে শুক্রবার সকালে মনু নদীর রিং বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে তিনটি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে উজানে বৃষ্টিপাত না থাকায় নদীর পানি কমতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জেলার নদীগুলোর প্রতিরক্ষা বাঁধে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হয়েছে। সুযোগ পেলেই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
বর্তমানে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় দুর্গত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন।
মন্তব্য করুন