মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কয়েকদিন আগেও সবুজে মোড়া আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজির খেত দেখে কৃষকদের চোখে ছিল স্বপ্নের ঝিলিক। কিন্তু হঠাৎ নেমে আসা বন্যার পানিতে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেছে সেই স্বপ্ন।
বন্যার পানি নেমে গেলেও বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন কাদামাটিতে চাপা পড়ে আছে কৃষকের শ্রম, ঘাম আর বিনিয়োগ। অনেক জমিতে পলি ও বালু জমে থাকায় নতুন করে আবাদ শুরু করতে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। তবুও থেমে নেই কৃষকরা। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কেউ বীজতলা তৈরি করছেন, কেউ জমি পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ রোপা আমনের চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের একটাই আশা—আমন মৌসুমে অন্তত আউশের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৭০ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ৩০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২৬ হেক্টর সবজি খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মখাবিল এলাকার টমেটো চাষি আব্দুর রহিম বলেন, ঋণ নিয়ে দুই কিয়ার জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
একই এলাকার কৃষক তোফায়েল আহমেদ ও মজিদ খান জানান, তারা তিনজন মিলে ১০ কিয়ার জমিতে টমেটো চাষের জন্য জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ ও চারা রোপণ করেছিলেন। বন্যায় পুরো খেত নষ্ট হয়ে তাদের প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
পতনউষার ইউনিয়নের কৃষক শাহাজাহান মিয়া বলেন, তাদের এলাকা নদীভাঙনের শিকার না হলেও নিচু হওয়ায় ধানের জমি তলিয়ে গেছে। ফলে এবার ভালো ফলন হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বীজতলা হারানো কৃষক আব্দুল মন্না বলেন, বানের পানিতে তার আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে রোপা আমনের আবাদ করবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না।
অপর কৃষক মরম আলী বলেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে টমেটো চাষ করেছিলেন। কিন্তু ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন সংসার চালানো ও ঋণ পরিশোধ—দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। তালিকা সম্পন্ন হলে দ্রুত বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে।
বন্যায় স্বপ্ন ভেঙে গেলেও হাল ছাড়েননি কমলগঞ্জের কৃষকরা। নতুন উদ্যমে আবারও মাঠে ফিরেছেন তারা। তবে তাদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছালে আমন মৌসুমে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে পারবেন এবং পরিবারের মুখে আবারও হাসি ফিরবে।
মন্তব্য করুন