নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আজ আমি হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী আপনাদের সামনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরছি। “ওয়া মা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।”
ইসলামী দাওয়াত মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুলকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় তুলে ধরার জন্য এবং তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বান করার জন্য। নবী-রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব ছিল সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা। তারা সবাই তাদের উম্মতকে তাওহিদ ও ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছেন এবং শিরক ও পাপাচার থেকে সতর্ক করেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“যারা অনুসরণ করে সেই বার্তাবাহক উম্মী নবীকে, যার উল্লেখ তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজিলে লিপিবদ্ধ পায়। তিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন।”
(সূরা আল-আ’রাফ: ১৫৭)
ইসলামী দাওয়াত দেওয়া, অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। উম্মতে মুহাম্মদীর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
দাওয়াতের দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্বের আলোকে পালন করা উচিত। পরিবারের কর্তার দায়িত্ব স্ত্রী-সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দায়িত্ব শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা। একইভাবে সমাজের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসক, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও তাদের অধীনস্থদের সৎকাজে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(সহিহ বুখারি)
দাওয়াতের কাজ কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা, ইমাম-খতিব, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ইসলামী সংগঠনের কর্মী, লেখক, বক্তা—যে যার অবস্থান থেকে ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই একজনের কাজকে ছোট করে দেখা বা অন্যের দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।
মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করতে হবে নম্রতা, প্রজ্ঞা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
“তোমরা মানুষের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করো, কঠোরতা অবলম্বন করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করো না।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তাই ইসলামের দাওয়াত কেবল মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াজ মাহফিল বা খানকায় সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তাদের বিশ্বাস প্রচার করছে। মুসলমানদেরও উচিত ইতিবাচক, সত্যনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক উপায়ে ইসলামের সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা।
একই সঙ্গে দাওয়াতের কাজ মুসলিম ও অমুসলিম—উভয়ের কাছেই পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সুন্দর আচরণ, উত্তম চরিত্র এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতের মাধ্যমে বহু মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসেছে।
দাওয়াতের পথে অবহেলা, সমালোচনা বা কষ্টের সম্মুখীন হলেও হতাশ হওয়া যাবে না। কারণ, নবী-রাসুলরাও দাওয়াত দিতে গিয়ে নানা বাধা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
“একজন বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।”
(সহিহ মুসলিম)
অন্যের ঈমান ও আমল সংশোধনের কাজে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে আল্লাহ তাআলা নিজের ঈমান ও আমলও সুন্দর করে দেন।
পরিশেষে, ইসলামী দাওয়াত কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; বরং এটি প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুন্দর চরিত্র, উত্তম আচরণ, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতি কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদরাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন