সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দুই মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় মানুষের উপস্থিতি না থাকায় সুন্দরবনের প্রাণীকুল এখন অনেক বেশি স্বস্তিতে রয়েছে। বেড়েছে বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ।
গত জুলাই মাসে সুন্দরবনের অন্তত পাঁচটি এলাকায় মোট আটটি বাঘের দেখা মিলেছে। একই সময়ে বনজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণের চলাচলও লক্ষ্য করেছেন বনকর্মীরা। সচরাচর সুন্দরবনে বাঘের দেখা না মিললেও এক মাসে এতগুলো বাঘের উপস্থিতি বন বিভাগকে আশাবাদী করে তুলেছে।
বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। অন্যদিকে ২০২৩ সালে বন বিভাগ ও আইইউসিএনের যৌথ জরিপে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণের অস্তিত্বের তথ্য উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আষাঢ়-শ্রাবণের পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং বনে মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে নদী ও খালের লবণাক্ততা কমেছে। ফলে বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য প্রাণীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং তারা স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারছে।
গত ১৫ জুলাই বিকেলে সুন্দরবন রেঞ্জ এলাকায় একসঙ্গে তিনটি বাঘকে নদী পার হতে দেখেন বনকর্মীরা। এরপর ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন কার্যালয় এলাকায় একটি বাঘের উপস্থিতি দেখা যায়। ২৬ জুলাই শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট সংলগ্ন নদীতে সাঁতার কাটতে দেখা যায় আরেকটি বাঘকে। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি আন্ধারমানিক ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় ক্যামেরা স্থাপন করেছে বন বিভাগ। গত ১৩ জুলাই ক্যামেরা স্থাপনের পর ১৪ ও ২৪ জুলাই সেখানে তিনটি বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কে মাছ ও বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ সীমিত রাখা হচ্ছে, যা ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, হরিণের সংখ্যা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাঘের উপস্থিতিও বাড়ে। গত এক বছরে বনরক্ষীদের ফুট ট্রেইল কার্যক্রম জোরদার করায় বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ফলে হরিণের চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাঘের বিচরণও আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, বনকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশ্রাম দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। করোনা মহামারির সময়ও মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও বিচরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা হলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। তাই এই বনকে রক্ষা করতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাস ও প্রজনন নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন